আগামী নির্বাচনে নন-ইস্যুই মূল ইস্যু হতে পারে শামছুদ্দীন আহমেদ

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতোই ঘনিয়ে আসছে ততোই নন ইস্যুই যেন মূল ইস্যু হয়ে উঠছে। সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা, অনিয়ম ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে না পারার সমালোচনার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ প্রাধান্য দিচ্ছে ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে। প্রতিপক্ষের এই প্রচারণার জবাব দিতে গিয়ে সরকারি দলও ধর্মকেন্দ্রিক প্রসঙ্গই বারবার সামনে টেনে নিয়ে আসছে। এর বাইরে অন্যরাও যার যার সুবিধা কিংবা অবস্থান অনুযায়ী ধর্ম সংক্রান্ত বিষয়কেই গুরুত্ব দিচ্ছে। ভোটার টানার কৌশল হিসেবে ধর্মের এই রাজনৈতিক ব্যবহার ক্রমশই বাড়ছে। এনিয়ে রাজনৈতিক দল-জোটগুলোর মধ্যে চলছে অন্যরকম এক প্রতিযোগিতা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে ধর্মীয় বিষয়ের এই নন ইস্যুই প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রাজনীতিতে ধর্মের এই ব্যবহার হঠাত্ আসেনি। রাজনীতিতে ধর্মের সরাসরি ব্যবহারে সংবিধানকেও অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে। বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ‘বিসিমল্লাহির রাহমানির রাহিম’, ‘আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ ও ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ ইত্যাদি বিষয় সংযোজনের মাধ্যমেই রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনা হয়। রবিবারের পরিবর্তে জুমার দিন শুক্রবারকে সাপ্তাহিক সরকারি ছুটির দিন ঘোষণাও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বৃদ্ধির আরেকটি উপসর্গ। বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতিও বদলে ফেলে ধর্মের ব্যবহারের পথ নির্মাণ করা হয়। বর্তমান সরকারের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হলেও কার্যত তা কেবল শব্দগত, কারণ রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বৃদ্ধির অন্য কয়েকটি উপাদান বহাল রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী নির্বাচন শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, সংকটময়ও বটে। সামগ্রিক রাজনীতি ধর্মনির্ভর হয়ে পড়ার যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তাতে নির্বাচনী সমীকরণ আরো জটিল হয়ে উঠছে। ধর্মীয় ইস্যুতে দেশের জনগণ কিংবা ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার ক্ষেত্রেই বেশি মনোযোগী হতে হচ্ছে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে। সংবিধানের হিসাব অনুযায়ী আগামী সংসদ নির্বাচনের বাকি আর কয়েক মাস হলেও অনেকেই এখনও এ ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে সক্ষম হয়নি। ধর্মের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যুতে যে রাজনৈতিক অস্পষ্টতার সৃষ্টি হয়েছে তা অন্ধকারের ছায়া ফেলছে নির্বাচনের ওপর।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই অস্পষ্টতা আরো প্রকট হলে তীব্র হতে পারে অস্থিরতা। রাজনীতিতে ধর্মের যথেচ্ছ এই ব্যবহার সতর্কতার সঙ্গে ও সঠিকভাবে মোকাবেলা করা না গেলে নির্বাচন কীভাবে হবে, হলেও সেই নির্বাচন কেমন হবে- তা নিয়ে শঙ্কা থাকতে পারে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত। তাদের মতে, এই শঙ্কা প্রসমনে এবং এই নন ইস্যুকে মূখ্য ইস্যু হতে না দেয়ার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে যারা বিভিন্ন জোটবন্দি হবে এবং যারা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবে তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। স্পষ্ট করার পাশাপাশি তা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখা জরুরি। এক্ষেত্রে যারা পিছিয়ে পড়বে, তাদের জন্য নির্বাচনী রাজনৈতিক রসায়ন জটিলতর হয়ে উঠতে পারে।

সংবিধানেই ধর্মীয় বিষয়কে টেনে আনার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে তাও দিনদিন বাড়ছে। এতে সরকার ভেদে হয়তো কখনও কখনও কৌশলের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে মাত্র। বিশিষ্টজনদের মতে, রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে, তবে ব্যক্তি সাধারণত ধর্ম নিরপেক্ষ হন না। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশে এই বিষয়টিকেই ভিন্নভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস চলমান। যার কারণে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠন করতে গিয়ে ক্রমেই রাজনীতি হয়ে উঠছে ধর্মনির্ভর। রাজনীতিকে এই জায়গায় নিয়ে আসার পেছনে বাম ও উগ্রপন্থিরা মূল ভূমিকা রেখেছেন বলে অনেকে মনে করছেন। আর তাদের এই ভূমিকার সঙ্গে টিকে থাকতে এখন ঘাম ঝরাতে হচ্ছে উদারপন্থিদের।

উদারপন্থি রাজনীতিবিদদের অনেকের মতে, বাংলাদেশের মানুষ কখনও সাম্প্রদায়িক নয়; তারা ধর্মভিরু, তবে ধর্মান্ধ নন। ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার- এই নীতিতেই এখানকার সাধারণ মানুষ বিশ্বাসী। তবে কতিপয় গোষ্ঠী কিংবা কিছু কিছু রাজনৈতিক সংগঠন নিজেদের স্বার্থে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারকে যথেচ্ছ করে তুলেছে। বর্তমানে এই ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। খোদ মহাজোট সরকারের কোনো কোনো অংশীদারও রাজনীতিতে ধর্মের বিষয়কে মূল ইস্যু করে তোলার প্রক্রিয়ায় প্রকাশ্যে ভূমিকা রেখেছে। সরকার যেখানে বিষয়টিকে মোকাবেলার নানা উপায় খুঁজছে, তখন জোটভুক্ত কারো কারো মন্তব্য-বিবৃতি এটিকে আরো ঘোলাটে করছে। ফলে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার মোকাবেলা আরো জটিল আকার ধারণ করছে, এতে শঙ্কা বাড়ছে নির্বাচন নিয়ে।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.