আজও চিহ্নিত হয়নি সিরাজগঞ্জের বধ্যভূমিগুলো


মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তির দ্বারপ্রান্তে স্বাধীন বাংলাদেশ, অথচ এই দেশটির মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে সিরাজগঞ্জে পাকবাহিনীর নির্বিচার গনহত্যার শিকার হওয়া শহীদদের তালিকা এবং গনহত্যা ঘটানো স্থানগুলো চিহ্নিত করে তা সংরক্ষনের উদ্যেগ গ্রহন করা হয়নি আজও। গনহত্যা স্মৃতিবিজরিত জেলার সদর উপজেলার বাগবাটি ইউনিয়নের হরিনা বাগবাটি, ছোনগাছা ইউনিয়নের শাহানগাছা, বহুলী ইউনিয়নের ধিতপুর, শিয়ালকোল ইউনিয়নের শিয়ালকোল, কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের তেতুলিয়া, পৌর এলাকার বাহিরগোলা ও জেলখানা ঘাট এবং সলঙ্গা’র চড়িয়ার গনহত্যা ঘটানো স্থানগুলো চিহ্নিত করে কোন স্থাপনা নির্মান বা সংরক্ষনের উদ্যেগ গ্রহন করা হয়নি। কোন স্বীকৃতি মেলেনি এই সকল গনহত্যায় প্রানহারানো মানুষগুলোরও। ফলে প্রাপ্য সন্মান না পাওয়ায় একদিকে হতাশায় ভুগছেন শহীদ পরিবারগুলো অন্যদিকে গনহত্যার স্থানগুলোর উপর স্থাপনা বা বসতবাড়ি নির্মিত হওয়ায় গনহত্যার স্মৃতিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিভিষিকাময় গনহত্যার স্মৃতি সংরক্ষনের কোন উদ্যোগ গৃহীত না হওয়ায় নতুন প্রজন্মের কাছে অজানাই থেকে যাচ্ছে তাদের পূবসূরিদের আত্বত্যাগের ইতিহাস। স্বীকৃতি না পাবার হতাশায় নিমজ্বিত শহীদ পরিবারগুলোর রাষ্ট্রেযন্ত্রের কাছে দাক্ষি গনহত্যার স্মৃতি সংরক্ষনে সরকারি কার্য্যকর পদক্ষেপ ও তার বাস্তবায়ন।

জেলার গনহত্যা ঘটা এই স্থানগুলো সরেজমিন ঘুড়ে গনহত্যা’র স্থান ও শহীদ পরিবারগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরবে সিরাজগঞ্জ নিউজ ২৪ আজ প্রথম পর্বে থাকছে ছোনগাছা ইউনিয়নের শাহানগাছা ও শালুয়াভিটার চিত্র।

সাজিরুল ইসলাম সঞ্চয় ঃ সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছোনগাছা ইউনিয়নের শাহানগাছা গ্রাম, শান্তু সুনীবির গ্রামের মাঝে অযতœ আর অবহেলায় ঝোপ-ঝাড়ে ঢাকা পড়ে আছে সারি সারি চারটি কবর। এই চারটি কবরের একটিতে চিরনিদ্রায় শায়ীত আছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় সংগঠক, তৎকালিন ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি ও স্কুল শিক্ষক শহীদ নুরুল ইসলাম।

চিহ্নিত না হওয়া গনহত্যার স্থানগুলো সরেজমিন ঘুড়ে ও শহীদ পরিবারগুলোসূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তৎকালিন সিরাজগঞ্জের ছাত্রনেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আমির হোসেন ভুলু ও পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল লতিফ মির্জা’র নেতৃত্বাধিন মুক্তিযোদ্ধারা মাঝে মাঝে আশ্রয় নিতেন এই নুরুল ইসলামের শাহানগাছার বাড়িতে। তিনি সাধ্যমত মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার ও থাকার ব্যাবস্থা করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করতে যোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সংরক্ষন করতেন নিজের কাছে। পাশাপাশি নিজের পরিবারের দুই সদস্য ও এক কর্মচারিকে নিয়োজিত করেছিলেন পাকবাহিনীর যাতায়াতের উপর নজর রাখার জন্য।

স্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধীদের মাধ্যমে তথ্যগুলো পাকবাহিনীর কাছে পৌছে যাওয়ার পর ১৯৭১ ইং সালে’র ২৪শে আগস্ট তারা হামলা চালায় নুরুল ইসলামের বাড়িতে। এ সময় নুরুল ইসলাম, তার দুই ভাতিজা কলেজ ছাত্র আবুল কালাম আযাদ ও সাইফুল ইসলাম এবং কর্মচারি মজিবর রহমানকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এদের বসত-বাড়িসহ শাহানগাছা গ্রামের বেশ কিছু স্থানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। একই দিনে পাশ্ববর্তী পেচিবাড়ি গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আঃ সাত্তারের পিতা সোহরাব মল্লিক ও পুন্য হালদারকে হত্যা করে সিরাজগঞ্জ শহরে ফিরে যাবার পথে পাক হানাদারেরা শালুয়াভিটা নদী পার হবার সময় নুরুল ইসলাম, তার দুই ভাতিজা কলেজ ছাত্র আবুল কালাম আযাদ ও সাইফুল ইসলাম এবং কর্মচারি মজিবর রহমানকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে চলে যায়। নিহতের পরিবার লাশগুলো নিজ গ্রামে এনে সমাহিত করেন। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে আজও নুরুল ইসলামসহ এই ছয়জনের হত্যার স্থানগুলো সংরক্ষন বা এদের শহীদ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে স্বীকৃতি প্রদানের কোন উদ্যোগই গ্রহন করা হয়নি। বারবার আবেদন করে বিভিন্ন স্থানে দাবি জানিয়ে কোন কাজে না আসায় স্বীকৃতি না পাওয়ার হতাশায় ভুগছেন এদের পরিবারগুলো।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ও দুই হাজার টাকা পাবার কথা স্বীকার করে এই ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহত নুরুল ইসলামের পূত্র, স্কুল শিক্ষক আব্দুল মান্নান দৈনিক সিরাজগঞ্জ বার্তাকে জানান, পিতাসহ পরিবারের চারজনকে হারিয়েছি যে দেশের অভ্যুদয়ে সেই দেশ স্বাধীন হবার ৪৭ বছর পরেও সরকারি কোন স্বীকৃতি বা মর্যাদা পাইনি আমরা। বঙ্গবন্ধু কন্যা দির্ঘদীন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অথচ বারবার আবেদন করে আমাদের কোন কাজ হচ্ছে না।

ক্ষোভ প্রকাশ করে আব্দুল মান্নান আরো বলেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান বা ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে অথচ তারা দিব্বি সকল সুবিধা ও মর্যাদা ভোগ করছে। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরষেরা তাদের আত্বত্যাগ করার পরও কেন তাদের স্বীকৃতি দেয়া হবে না। কেন তাদের স্মৃতিগুলো সংরক্ষন করে নতুন প্রজন্মের সামনে তা তুলে ধরার উদ্যেগ নেয়া হবে না।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ঘটা গনহত্যা’র স্থান ও ইতিহাস সঠিকভাবে সংরক্ষন করা সম্ভব হচ্ছে না স্বীকার করে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার গাজী শফিকুল ইসলাম শফি সিরাজগঞ্জ নিউজ ২৪কে জানান, এই গনহত্যা’র ইতিহাসগুলো সংরক্ষনের উদৌগ গ্রহন না করায় অনেক স্থান বিভিণœভাবে ব্যাবহৃত হয়ে পড়েছে, যে গুলো বধ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি ও সংরক্ষন হওয়া উচিত ছিল।

গনহত্যায় নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বিষয়ে তিনি আরো বলেন, প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধচলাকালিন সময়ে রনাঙ্গনে যে যোদ্ধারা শহীদ হয়েছে তাদেরকেই শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। পাকবাহিনী বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে যাদের হত্যা করেছে তাদের কোন স্বীকৃতি সরকার দেয়নি বা মুক্তিযোদ্ধা সংসদকেও এদের বিষয়ে কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ গনহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম বলেন, রাষ্টীয়ভাবে ঘোষনা করা হচ্ছে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে, সিরাজগঞ্জে বিভিন্ন স্থানে পাকবাহিনীর হাতে যারা নিহত হয়েছে তারা অবশ্যই শহীদ। এদের অনেকের পরিবারের কাছে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু প্রেরিত চিঠি সংরক্ষীত রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, রনাঙ্গনে না গিয়েও যারা পাকবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে এদের অনেকের শহীদের তালিকায় ঠাই পাবার নজির রয়েছে। রাজধানি’তে অনেকেই শহীদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুবিধা ভোগ করছেন। কিন্তু এই তালিকা তালিকা খেলায় সিরাজগঞ্জের শহীদেরা বঞ্চিত রয়েছেন।

সাইফুল ইসলাম আরো বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্র, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, গনমাধ্যম, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর উচিত আন্তরিকতার সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গনহত্যা ঘটা স্থানগুলো সংরক্ষন ও এই স্থানগুলোতে প্রানহারানোদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ের উদ্যোগ গ্রহন করা। এবং গনহত্যা দিবসগুলো পালনের মাধ্যমে শহীদদের এই আত্বত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানার সুযোগ করে দেওয়া

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.