আমি অনেক পরিবর্তন হয়েছি..! ড. মঞ্জুরে খোদা

12313838_544996445650212_3940821958507616875_nবিভিন্ন সময় একটি মন্তব্য শুনতে হয় যে, আমি অনেক পরিবর্তন হয়েছি! যে কথার মানে হচ্ছে, আমি আগে যেমন ছিলাম, এখন আর তেমনটি নেই! আগে কেমন ছিলাম? এ প্রশ্নে নিজের আয়নায় অতি প্রান্তগুলো হয়তো ধরা মুশকিল! কিন্তু তারা হয়তো বলতে চান, আগে বোধহয় আমি অনেক বিপ্লবী, উচ্ছল, প্রাণবন্ত, উপযাচক, গল্পবাজ, সহজ ইত্যাদি ছিলাম! এখন আর তেমনটা নেই! এখন এসব ক্ষেত্রে আমার অনেক পরিবর্তন হয়েছে, এমন ভাবনা থেকেই অনেকে এ কথা বলেন ও মন্তব্য করেন! বদলে যাওয়ার কথা যখন শুনি তখন মুনীর চৌধুরীর সেই বিখ্যাত উক্তির কথা মনে হয়, মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়..! যা বদলায় তা গতিশীল। জর কখনো বদলায় না। এটাই বিজ্ঞান।

পরিবর্তন হচ্ছে এক ধরণের অবস্থান, যার মাধ্যমে কোন কিছুর-বিষয়ের মান ও অবস্থানগত তারতম্যকে বুঝায়। এটা অস্বাভাবিক কোন বিষয় না। পরিবর্তন হচ্ছে সমাজ ও প্রকৃতির গতিশীলতার অংশ। এই বদলানো বা পরিবর্তন ভাল-মন্দ দুই দিকেই হতে পারে। বিষয়টি সম্পর্কিত ও আপেক্ষিক! মানুষের চিন্তা, দর্শন, জ্ঞান, বিশ্বাস, দৃষ্টিভোঙ্গী ও অবস্থানের উপর নির্ভর করে এর ভাল-মন্দ! সঙ্গতই পরিবর্তন মানেই খারাপ কোন কিছু না! পরিবর্তন মানেই নেতিবাচক কোন কিছু না! কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে এই বিষয়কেও নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়। তারচেয়ে বড় প্রশ্ন যারা এই ভাবনা দ্বারা তাড়িত, তাঁরা তাদের নিজেদের পরিবর্তনগুলো খেয়াল করেন না! অথবা চিন্তুা করতে ও দেখতে অক্ষম!

জীবন ও সংগ্রাম, মানুষ ও পরিবর্তন খুব অঙ্গাঙ্গী! মানুষ মূলত সংগ্রাম করে কারো বিরুদ্ধে না! সে আসলে সংগ্রাম করে তার নিজের বিরুদ্ধে। তার বর্তমান অবস্থানকে কর্মের মাধ্যমে একটি উন্নত, স্বস্তিকর, নিরাপদ ও কাঙ্খিত স্থানে নিয়ে যেতে চায়। ব্যক্তির ক্ষেত্রে সে চাওয়া কখনো আত্মকেন্দ্রীক ও স্বার্থপর হলেও সমষ্টির ক্ষেত্রে তাকে আর স্বার্থপর বলা যায় না! এবং ব্যক্তির চাওয়াই ক্রমে সমষ্টির অংশ হয়। সামগ্রিক চাওয়ার সেই আকাঙ্খা থেকে নিজেকে আজও প্রত্যাহার করিনি! ভিন্ন অবস্থানে থেকেও তার পক্ষে আজও কাজ করছি, সংগ্রাম করছি।

বলতে পারেন, আমি নিরাপদ অবস্থানে থেকে সে কথাগুলো বলছি! কিন্তু যখন চরম বৈরী পরিস্থিতিতে ছিলাম তখন কি কাজ করিনি? বলতে পারেন, কতগুলো মামলা ছিল আমার বিরুদ্ধে? কতবছর আত্মগোপনে ছিলাম? কতশত বার কোর্টে হাজিরা দিতে হয়েছে? কতবার জেলে যেতে হয়েছে? কতবার প্রতিপক্ষ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি? কতবার পুলিশী আক্রমনের স্বীকার হয়েছি? কতবার হুমকি পেয়েছি? কতটা বিপর্যস্ত ছিল আমাদের পরিবার? প্রথমত, কোনভাবেই আমি আমার বর্তমান অবস্থানকে যৌক্তিক প্রতিপন্ন করতে একথাগুলো বলছি না! বলছি তাদের জন্য যারা মনে করে কেবল হটাত করেই বর্তমান অবস্থানে চলে এসেছি! নিজের যদি কোন অর্জন থাকে তা এমনিতেই এসেছে, বিষয়টা তা নয়। তারপরও আমি নিজেকে এক ধরণের পলায়নপর ও স্বার্থপর মানুষই মনে করি। একটি অবস্থান ও ভাবনাকে যৌক্তিক প্রতিপন্ন করতে এমন কোন তত্ত্বের/বক্তব্যের আশ্রয় নিতে চাই না, যাতে নিজের অকৃতজ্ঞতা ও ক্ষুদ্রতা প্রকাশ পায়!

যে পরিবর্তনগুলো এই সময়ে আমার জীবনে ঘটেছে তা সচেতনভাবে, পরিকল্পিত ভাবে, একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে। অতএব এটাকে হটাত কোন পরিবর্তন আমি মনে করি না! অন্তত আমার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনকে জীবনের একটি ইতিবাচক পরিবর্তন-অবস্থান মনে করি। তারপরও অন্যদের কোন অভিযোগ/অনুযোগ নেতিবাচক ভাবে দেখছি না! বরং আমাকে ঘিরে তাঁদের আকাঙ্খার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু যে সব ভাই-বোন’রা এই অভিযোগ, অনুযোগ, আক্ষেপের কথা বলছেন, আপনারা আপনাদের পরিবর্তনগুলো কি বুঝতে পারেন?

সেই সময় যে মেয়েদের হাতে তসলিমার লজ্জা, হুমায়ুন আজাদের নারী, সমরেশের কালবেলা-কালপুরুষ, তারা শংকের, মৈত্রীদেবী, জীবনানন্দ, পূর্ণেন্দ্র পত্রী, শংঘ ঘোষ, আরজ আলী, ফ্রয়েড’র বই দেখেছি.. তাদের হাতে দেখছি মরণের আগে ও পরে জাতীয় বিভিন্ন হাদিসের বই! পুঁজিবাদ-নারীবাদ নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্ক করতে শুনেছি। ফ্রয়েড, পুরুষতন্ত্র, নারীবাদ নিয়ে তির্যক মন্তব্য করতে শুনেছি। জরায়ুর স্বাধীনতার কথা বলেছেন! বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল এমন অনেকে ভাববাদ-বস্তুবাদ-সমাজতন্ত্র-পুঁজিবাদ ইত্যাদি নিয়ে তর্ক জুড়ে দিয়েছেন! তাদের প্রফাইল সাজানো আজ হাদীসের নানা বাণী ও আধ্যাত্বিক কথাবার্তায়! এখন তাঁরা সব বোরকা ও হিজাব পরে মহাধার্মিক..! কয়েক মিনিটেরে কথায় শতবার মাশসাল্লাহ, ইনশাল্লাহ, আল্লাহর রহমত বলছেন! নিজের সন্তানকে দামী ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়ে, কওমী মাদ্রাসার দরিদ্র-এতিম ছেলেমেয়েদের দরদি সেজে, অন্যকে নসিহত করছেন!

যারা হজ্বের অর্থ দিয়ে আর্তমানবতার সেবার কথা বলেছেন। কোন কন্যাদায়গ্রস্থ পিতাকে সাহায্য করা বা কোন দরিদ্রের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে দশবারের হজ্জের সওয়াব হয় বলেছেন! বলেছেন, হজ্জের মাধ্যমে দরিদ্র দেশের কষ্টের মুদ্রা বিদেশে চলে যায়। হ্জ্ব বাণিজ্যের অর্থে সৌদি রাজপরিবার ফূর্তি করে, অস্ত্র কেনে বলেছেন! তারা নিজেরাই পরিবার নিয়ে হজ্ব করছেন! রাজনীতিকদের ব্লাডি… ইত্যাদি বলে গ্লালি দিচ্ছেন! নীতি-নৈতিকতার কথা বলছেন..! সরকারী চাকুরী করে কুড়েঘর থেকে ঢাকায় একাধিক দামী গাড়ী-বাড়ী এপার্টমেন্টের মালিক হয়েছেন! নিজের ছেলেমেয়েদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াচ্ছেন, খোঁজ করছেন এখন কিভাবে সন্তানদের ইউরোপ-আমেরিকা পাঠানো যায়, বাকী জীবন কিভাবে বিদেশে কাটানো যায়! সেকেন্ড হোমের অর্থ যোগাতে নাক ডু্বিয়ে দূর্ণীতি করছেন, আর পরিবর্তন দেখছেন কেবল অন্যের মধ্যে!

আমি দেশে নেই, সেটা নিয়ে আপনাদের আক্ষেপের অন্ত নেই! কিন্তু যারা দেশে থেকে সংগ্রাম করছে, তাদের খবর কি কখনো নিয়েছেন? জানেন কি তারা কেমন আছে? কতটা বিপদ ও ঝুকির মধ্যে তারা কাজ করছে? কোনদিন তাদের কি কোন সহযোগিতা করছেন? রাস্তায় নেমে কখনো কোন একটি হত্যা, ধর্ষণ, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন..? যেদিন এমনটা ঘটবে, দেখবেন আমিও আপনাদের পাশে আছি! এই আলোচনা, আক্ষেপ ও অবিশ্বাস হবে অতীত! যদি তার ব্যতিক্রম ঘটে, সময় ও প্রয়োজনই খুঁজে নেবে, রণভঙ্গ দেয়া পলাতক কোন সৈনিকের বিপরীতে, নতুন কোন সেনাপতি!

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.