একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনঃ প্রার্থী যারা, কেমন তারা!

এবারের সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দল ও জোট থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন ১২ হাজারেরও বেশি প্রার্থী। প্রতি আসনে ছিলেন গড়ে প্রায় ৪০ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী, যা অতীতের সকল রেকর্ডকেই ছাড়িয়ে গিয়েছে। তবে জনসাধারণের উৎসাহ ছিল মূলত প্রধান দুই জোটের প্রার্থী তালিকার দিকেই। তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, কেমন প্রার্থীর হাতে তুলে দেয়া হবে মনোনয়নের চিঠি।
তবে শুরুতেই তাদের দ্বিধায় ফেলে দিয়েছিলো বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট। প্রতি আসনে তিন থেকে চার জনের হাতে মনোনয়নের চিঠি তুলে দেয় জোটটি। ঘোষণা দেয়, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট অবশ্য অধিকাংশ আসনেই চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করে ফেলেছে আগেভাগেই। কিছু আসনে দলীয় প্রার্থীর অসুস্থতা ও জোটগত কারণে বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়।

তবে নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে উভয় জোটই ইতোমধ্যে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করেছে। তাই জনসাধারণ এখন হিসেব কষছেন, কেমন প্রার্থী পেলেন তারা! জনসাধারণের সাথে কথা বলে পাওয়া যায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একটি জোটের মনোনয়নপ্রক্রিয়া নিয়ে তারা কিছুটা ক্ষুব্ধও বটে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট স্বচ্ছ ও জনপ্রিয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি জগতের অনেক তারকাই আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। এদের মধ্যে কয়েকজনকে মনোনয়ন দেয়া হয়। ক্রীড়াঙ্গনের নক্ষত্র মাশরাফি বিন মর্তুজা, চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তী নায়ক ফারুক পাঠান, সংগীতাঙ্গনের আইকন মমতাজ নৌকার প্রার্থী হয়ে ঘরে ঘরে যাচ্ছেন উন্নয়নের বার্তা নিয়ে।
তারুণ্যকে অগ্রাধিকার দেয়া দল আওয়ামী লীগ বেশকিছু তরুণ প্রার্থীকেও মনোনয়ন দিয়েছে। প্রয়াত জাতীয় নেতা আব্দুল জলিলের পুত্র তরুণ নিজাম উদ্দিন জনের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে নৌকা প্রতীক। মনোনয়ন পেয়েছেন আরেক প্রয়াত জাতীয় নেতা আব্দুর রাজ্জাক পুত্র নাহিম রাজ্জাকও।
তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মতো বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি আস্থা রাখা হয়েছে নসরুল হামিদ বিপু, ফজলে নূর তাপস, ব্যারিস্টার নওফেল, নাসের তন্ময়ের উপরেও। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ যেন অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের এক সুবিবেচিত সমারোহ।
জোটের শরিক দলগুলোও প্রতিটি আসনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে।
অন্যদিকে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা দেখে হতাশ সকলেই। নেতিবাচক রাজনীতির ধারা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি তারা। খোদ দলের ভেতর থেকেই হাজারো অভিযোগ আসছে এ তালিকা নিয়ে। মনোনয়ন বাণিজ্য করে কয়েকশো কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তারেক ও তার বাহিনী, এ অভিযোগ এসেছে দল থেকেই।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যুদ্ধাপরাধের দায়ে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী আসন্ন নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসন থেকে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী।
টাঙ্গাইল-২ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুস সালামের ভাই ।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আগে মামলার অন্যতম আসামি মুফতি হান্নান ও তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ অন্য আসামিরা তার কাছে হামলার পরিকল্পনার কথা জানান।
এছাড়া চারদলীয় জোট সরকার আমলে জেএমবি নেতা বাংলা ভাইকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগে বিতর্কিত হওয়া বিএনপি নেতাদেরকে এবারও দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
তারা হলেন- বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলের মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক (রাজশাহী-১), মিজানুর রহমান মিনু (রাজশাহী-২) ও আলমগীর কবির (নওগাঁ-৬)।
এসব নেতাদের বিরুদ্ধে ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি শাসনামলে জঙ্গিবাদে মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী তাহমিনা জামান শ্রাবণীকে নেত্রকোনা-৪ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে বিতর্কিত হওয়া গোলাম মাওলা রনিকে এবার বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে পটুয়াখালী-৩ আসনে। বর্তমান ও সাবেক ছাত্রদল এবং যুবদলের দুই ডজনের বেশি নেতাকে প্রথমবারের মতো দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।
এই তালিকায় রয়েছেন- ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাজিব আহসান, সহ-সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন এবং সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসেন। তাছাড়া ৩৫ পেশাজীবীসহ এবার নতুন মুখের পাশাপাশি মধ্যম শ্রেণির কিছু তারকাকেও প্রার্থী করেছে বিএনপি, যাদের বিজয়ের সম্ভাবনা খুবই কম বলে কর্মীরাই মনে করছেন। প্রার্থী তালিকায় আছেন অশ্লীল ছবির নায়িকা শায়লাও।
অন্যদিকে খোদ যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের ৪৭ প্রার্থীর ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস হতে প্রেরিত এক বার্তায় এসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদে মদদদানের সুস্পষ্ট অভিযোগ আনা হয়।

মার্কিন দূতাবাস যে ৪৭ প্রার্থীর ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে তাদের মধ্যে ২২ জনই জামায়াতের প্রার্থী। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে তারা। পাশাপাশি আছেন অনেক বিএনপি নেতারাও। এদের মধ্যে আছেন, দিনাজপুর-১ আসনের মোহাম্মদ হানিফ, দিনাজপুর-৬ আসনের আনোয়ারুল ইসলাম, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের আবদুল হাকিম, নীলফামারী-৩ আসনে মো. আজিজুল ইসলাম, গাইবান্ধা-১ আসনে মাজেদুর রহমান, জয়পুরহাট-১ আসনে ফজলুর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে শাহজাহান মিয়া, নওগাঁ-১ আসনে মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁ-৬ আসনে আলমগীর কবির, রাজশাহী-১ আসনে আমিনুল হক, রাজশাহী-৫ আসনে নাদিম মোস্তফা, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে রকিবুল ইসলাম খান, পাবনা-৩ আসনে আনোয়ারুল ইসলাম, পাবনা-৫ আসনে ইকবাল হোসেন, জামালপুর-১ আসনে রশিদুজ্জামান মিল্লাত, শেরপুর-২ আসনে ফাহিম চৌধুরী, ময়মনসিংহ-১ আসনে আলী আজগর, ময়মনসিংহ-৭ আসনে জয়নাল আবেদিন, ময়মনসিংহ-৯ আসনে খুররম খান চৌধুরী, বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা-১৫ আসনে শফিকুর রহমান, রাজবাড়ী-১ আসনে মাহমুদ খৈয়াম, রাজবাড়ী-২ আসনে নাসিরুল হক, মেহেরপুর-১ আসনে মাসুদ অরুণ, ঝিনাদহ-৩ আসনে মতিয়ার রহমান, যশোর-৫ আসনে মুফতি ওয়াক্কাস, বাগেরহাট-৪ আসনে আব্দুল আলীম, খুলনা-৫ আসনে গোলাম পরওয়ার, সাতক্ষীরা-২ আসনে আব্দুল খালেক, সুনামগঞ্জ-৩ আসনে শাহিনুর পাশা চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৫ আসনে শামসুল ইসলাম প্রমুখ।

এদের বিরুদ্ধে ৪ টি গুরতর অভিযোগ এনেছে মার্কিন দূতাবাস। সেগুলো হলো:
১. এরা গণতন্ত্র চর্চায় বিশ্বাসী না।
২. দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে এরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।
৩. আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এরা জঙ্গি অর্থায়নসহ নানাভাবে জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাহায্য নেবে বলে ধারণা করছে মার্কিন দূতাবাস।
৪. এরা যদি নির্বাচনে জয়লাভ করে, তবে বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনগুলো মদদ পাবে এবং জঙ্গি কার্যক্রমে উৎসাহিত হবে বলে মনে করছে মার্কিন দূতাবাস।
মূলত সন্ত্রাস-দুর্নীতিতে জড়িত থাকা ব্যক্তিরাই পেয়েছেন এ জোটের মনোনয়ন। অধিকাংশ আসনেই দল মনোনীত প্রার্থীরা দলীয় লোকদের কাছ থেকেই প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছেন। এমনকি বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে দলের চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ের সামনেও। বিক্ষুব্ধ কর্মীরা চেয়ারপার্সনের অফিসেও হামলা চালায়, ভাংচুর করে। প্রশ্ন উঠেছে, তারেক জিয়ার মতো একজন দণ্ডিত আসামীর হাতে বিএনপি কীভাবে মনোনয়নের সার্বিক দায়িত্ব তুলে দিলো!
সবমিলিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের ইতিবাচক রাজনীতির বিপরীতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট স্বভাবসুলভ নেতিবাচক রাজনীতিরই নজির স্থাপন করলো, এমনটিই বলছেন বিশ্লেষকেরা।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments