কাতারকে পদানত করা যাবে কি?

5555555555১৯৬৭ সালের ৫ জুন। এই দিনে শুরু হওয়া ছয় দিনের আরব-ইসরাইলের যুদ্ধে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর এবং গাজা চলে যায় ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে। সেই থেকে এই দিনটি ফিলিস্তিনি জনগণ ‘নাকসা’ দিবস হিসাবে পালন করে আসছে, যার মানে হচ্ছে দুর্যোগের দিন। দীর্ঘ ৫০ বছর পর ঠিক একই দিনে আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের ছোট্ট দেশ কাতারকে জল, স্থল, অন্তরীক্ষে অবরুদ্ধ করেছে ইসরাইল নয়, কাতারেই ভাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী ক’টি দেশ। কাতারের অপরাধ, কাতার  সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে।  মনোযোগ দিয়ে পুরো ঘটনাবলি একটু বিশ্লেষণ করলে এই নাটকের মূল উদ্দেশ্য কী এবং নেপথ্যের মূল কুশীলব কারা তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়।

 

কাতারকে সন্ত্রাসীদের দোসর বলে যারা মুখে ফেনা তুলছেন তারা কি ধোয়া তুলসি পাতা? তালিবান, আল-কায়েদা, লস্কর-ই-তৈয়বা, আল-নুসরা ফ্রন্ট, দেশে দেশে বিভিন্ন সালাফি জিহাদি গ্রুপের পৃষ্টপোষক কারা? এইতো কিছুদিন আগে টুইন টাওয়ার আক্রমণের জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য আমেরিকার সিনেটে বিল পাশ করা হল। কাতারকে ইরানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলা হচ্ছে অথচ সৌদি জোটের সব দেশ ইরানের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক বহাল রেখেছে। ইরানকে বলা হচ্ছে সব অনিষ্টের মূল অথচ সেই ইরানই হচ্ছে আমিরাতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ইরানের উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার পর এই দু’দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলারে ছাড়িয়ে গেছে। সেলুকাস! এদিকে সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে বলে যে দেশের বিরুদ্ধে এতো ক্ষোভ সেই কাতারেই রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি ও কমান্ড সেন্টার। যেখানে মোতায়েন করা আছে ১০,০০০ চৌকস আমেরিকান সৈন্য। এই ঘাঁটি থেকেই অত্যাধুুনিক প্রযুক্তি দিয়ে ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে পরিচালিত হচ্ছে তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই।

 

আসলে সন্ত্রাসবাদ, ইরান এগুলো হচ্ছে মানুষকে বোকা বানানোর প্রচেষ্টা মাত্র। কাতারের বিরুদ্ধে যা করা হচ্ছে তা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল এবং আমেরিকার তৈরি নীলনকশারই অংশ মাত্র।   সৌদি জোটের মূল ক্ষোভের কারণ হচ্ছে গাজায় ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর একমাত্র প্রতিরোধ শক্তি হামাসের প্রতি কাতারের সমর্থন। ইসরাইলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন না করার জন্য একটি বুলেট খরচ না করেও আরব দেশের জোট দিয়েই কাতারকে শায়েস্তা করতে সফল হয়েছে ইসরাইল।  অসির চেয়ে মসি বড় তা প্রমাণ করেছে আল-জাজিরা। একমাত্র আল-জাজিরাই তাদের সাহসী এবং প্রতিবাদী নিউজ রিপোটিং-এর মাধ্যমে বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর অপকর্মের কথা; খুলে দিয়েছে মিসরের স্বৈরাচারী মুবারক সহ অন্যান্য আরব শাসকদের মুখোশ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আরব বসন্তের খবর প্রচার করে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে আল-জাজিরা তাদের ক্ষমতার মসনদে। সৌদি জোটের আরব শাসকরা চায় না একমাত্র অনুমোদিত খবর ছাড়া তাদের নাগরিকরা আর বেশি কিছু জানুক। তারা জেনে গেছে স্বাধীনকণ্ঠ আল-জাজিরা থাকলে তাদের আর রক্ষা নেই।  তাইতো আল-জাজিরাকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য এতো আয়োজন। ইসরাইলি নীলনকশার পরবর্তী ধাপ হচ্ছে গাজা থেকে হামাসকে উত্খাত করে অনুগত কোনো দলকে ক্ষমতায় আনা। আর আল-জাজিরার কণ্ঠরোধ করতে পারলে বিশ্বজনমতকে অন্ধকারে রেখে এই লক্ষ্য অর্জন করা হবে অনেক সহজ।

 

তবে কাতারকে শায়েস্তা করার জন্য সৌদি-আমিরাত জোট যে চরম ব্যবস্থা নিল তা সফল হবে বলে মনে হচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে প্রথমত, সৌদি জোটের ধারণা, অবরোধ দেয়ার পর কাতারকে উদ্ধার করার জন্য কোনো বড় দেশ এগিয়ে আসবে না। কিন্তু তাদের এই অংক ভুল প্রমাণিত করে তুরস্ক, জার্মানি, ফ্রান্স সহ ইউরোপের বহু হেভিওয়েট দেশ এবং জাতিসংঘও কাতারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে কার্গো বিমানে করে তুরস্ক থেকে এসেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের চালান যা এখন দোহা শহরের বড় বড় সুপারমার্কেটের তাকে দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, কাতারে তুরস্কের সেনা ঘাঁটি স্থাপনের জন্য অনুমোদন দিয়েছে তুরস্কের পার্লামেন্ট। খুব সহসা এই ঘাঁটিতে তুর্কি সৈন্য মোতায়েন করা হবে। নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার উপর কাতার পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়, তুর্কি ঘাঁটি যেন সেই বার্তাই দিচ্ছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইতোমধ্যে রাশিয়ার সাথে আলাপ সেরে এসেছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে এখন ততটা উত্সাহ না দেখালেও তুরস্ক এবং ইরানের পথ ধরে অদূর ভবিষ্যতে রাশিয়া যদি কাতারের পক্ষে দঁড়িয়ে যায় তাতে অবাক হবো না।

 

দ্বিতীয়ত, সৌদি জোটের আরকটি বড় ধরনের ভুল হচ্ছে কাতারকে কোণঠাসা করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপর নির্ভর করা।  প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসলেই কী চান তা বুঝতে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে সিআইএ, এফবিআই, পেন্টাগনসহ খোদ আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। সেই ট্রাম্প যে সহসা ডিগবাজি খাবেন না সে বিষয়ে সৌদি জোট এতোটা নিশ্চিত হয় কী করে ? ভোর রাতে ঘুমের ঘোরে টুইটারে দু’কলম আবোল-তাবোল লিখে অনেক অনুসারী পাওয়া যেতে পারে কিন্তু তা দিয়ে দেশ পরিচালনা করা যায় না।  সৌদি বাদশাহ আয়োজিত রিয়াদের ৫০টি মুসলিম দেশের সন্মেলনে চতুর ব্যবসায়ী ট্রাম্প সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বাণিজ্য করে নিলেন। তবে সৌদি আরব যদি ভাবে অর্থের বিনিময়ে ট্রাম্প নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছেন সেটা হবে চরম ভুল।

 

তৃতীয়ত, আরব অঞ্চলের ৯০ শতাংশ মানুষ কাতারের বিরুদ্ধে আরোপ করা এই অন্যায় অবরোধ মেনে নিচ্ছে না। প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে পারছে না ঠিকই কিন্তু তাদের অন্তর জুড়ে রয়েছে কাতারের প্রতি সমর্থন ও ভালোবাসা। সাধারণ মানুষের সমর্থন না থাকলে সৌদি জোটের কোনো অবরোধই সফল হবেনা।

 

গালফ অঞ্চলের দেশগুলো একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। সৌদি আরব, আমিরাত এবং মিসরের বিদ্যুত্ এবং জ্বালানি কেন্দ্রগুলো চলে কাতারের গ্যাস দিয়ে। কাতার থেকে আমিরাত দৈনিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানি করে থাকে। কাতার যদি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তাহলে আবুধাবীর বহু আলিশান প্রাসাদের বাতি নিভে যাবে। কাতার এবং আরব আমিরাতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ হল প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। হাজারখানেক আমিরাতি কোম্পানি কাতারে যেমন কাজ করছে তেমনি চার হাজারেরও বেশি কাতারি কোম্পানি আমিরাতে সক্রিয়। অন্যদিকে মিসরের ৬০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ আসে কাতার থেকে। এই দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বন্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত  হবে সবাই। তাই নিজেদের নাক কেটে কাতারের যাত্রা ভঙ্গের চেষ্টা অদূরদর্শী এবং অর্থহীন বলেই মনে হচ্ছে।

 

বিশ্ব এখন একটি গ্লোবাল ভিলেজ। আল-জাজিরার সম্প্রচার নিষিদ্ধ করলেও সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে খবর পৌছে যাচ্ছে মানুষের কাছে । কাতারের সীমান্ত বন্ধ করে দিলেও আকাশ ও পানি পথে এখন তুরস্ক এবং ইরান থেকে আসছে বাণিজ্য পণ্য। মনে রাখতে হবে কাতারের শত্রু আছে ঠিকই কিন্তু শক্তিধর মিত্রের সংখ্যাও কম নয়। হোয়াইট হাউস ও আমেরিকার প্রশাসনে রয়েছে কাতারের বহু সমর্থক। ইরান ও গাজাতে দীর্ঘদিনের অবরোধ দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। তেমনি অবরোধ আর  হুমকি দিয়ে কাতারকে পদানত করার যে অলীক স্বপ্ন আমিরাত ও সৌদি আরব দেখছে তা সত্যি হবার কোনো লক্ষণ দেখছি না।
লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.