চারদিনে জমানো চল্লিশ টাকায় কেনা জাতীয় পতাকা হাতে বৃষ্টি¯স্নাত র‌্যালিতে শহীদের স্বজনেরা

সাজিরুল ইসলাম সঞ্চয় ( সিরাজগঞ্জ নিউজ ২৪ )

রামু, সম্পা, বেলমতী, স্বরস্বতী, কমলা, শাকিলা এরা সবাই শহীদ পরিবারের সদস্য। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এদের কারো বাবা-ভাই, কারো স্বামী, ভাসুর বা শ্বশুর শহীদ হয়েছেন। দীর্ঘ ৪৭ বছর পর এরা সবাই স্বজন হারানোর সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা বলতে সিরাজগঞ্জের গনহত্যা অনুসন্ধান কমিটি’র আয়োজনে ‘শহীদ পরিবার সমাবেশ’ এ যোগ দিতে এসেছেন স্ব-পরিবারে। এই সমাবেশের অংশ র‌্যালিতে দরিদ্র হরিজনদের প্রত্যেকের হাতে শোভা পাচ্ছে রোজগার থেকে শেষ চারদিনের প্রতিদিন দশ টাকা করে জমানো চল্লিশ টাকায় কেনা স্বজনের রক্তেভেজা লাল-সবুজ পতাকা।

শনিবার সকালে সিরাজগঞ্জ শহরের শহীদ এম মুনসুর আলী অডিটোরিয়ামের সামনে থেকে বৃষ্টির মধ্যেই শুরু হয় শহীদ পরিবারের সদস্যদের র‌্যলি, র‌্যালিটি পুরাতন পোষ্ট অফিস রোড, এস এস রোড ঘুরে শহীদ এম মুনসুর আলী অডিটোরিয়ামে এসে শেষ হয়।

শহীদ এম মুনসুর আলী অডিটোরিয়ামে কথা হয় ১৯৭১ এ বাবা-কাকা ও ভাইকে হারানো শহরের রেলওয়ে কলোনী হরিজন পল্লির রামু বাসফোরের সাথে। রামু জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুর দিকেই যেদিন পাকবাহিনী প্রথম সিরাজগঞ্জে আসেন সেদিনই রায়পুর রেলওয়ে স্টেশনে নেমে প্রথমে হানা দেয় হরিজন পল্লীতে। পুড়িয়ে হত্যা করে তার বাবা-কাকা ও বড় দাদাকে। দেশ স্বাধীন হবার পর সরকার বা কোন সংস্থা, কেউই আর খবর নেয়নি রামুদের পরিবারের। অর্ধাহারে অনাহারে বড় হয়েছেন, এখন স্ব-পরিবারে শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা রাস্তাঘাট পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে সংসার চালান। যা রোজগার করেন তাতে দিন আনে দিন খায় অবস্থা, সংসার খরচ শেষে একটি টাকাও অবশিষ্ঠ থাকে না।

হরিজন পল্লীর এই শহীদ সন্তান আরো বলেন, সম্প্রতি গনহত্যা অনুসন্ধান কমিটির নেতারা রামুর বাড়িতে গিয়ে তাকে স্বপরিবারে শহীদ পরিবার সমাবেশে আসার জন্য নিমন্ত্রন করে। এই সমাবেশে রামুর মত অনেক শহীদ পরিবারের সদস্যরা আসবে, স্বজন হারানোর স্মৃতিকথা বলার সুযোগ পাবে জানতে পেরে স্ব-পরিবারে এসেছেন সে। আর এই সমাবেশের অংশ র‌্যালিতে অংশনেবার জন্য একটি করে পতাকা নিয়ে আসতে বলা ছিল, আর তাই রামু প্রতিদিনের রোজগার থেকে দশ টাকা করে জমিয়ে চল্লিশ টাকায় একটি পতাকা কিনে নিয়ে এসছেন।

শহীদ পরিবারের এই সদস্য আরো বলেন, কেউ এতদিন আমাদের খোজ খবর নেয়নি, সিরাজগঞ্জের গনহত্যা অনুসন্ধান কমিটি আমাদের খোজ-খবর নিচ্ছে, দুঃখ, কষ্টের কথাগুলো শুনছে, আমাদের স্বজনদের শহীদের স্বীকৃতি আদায়ে আন্দোলন করছে। আমরা এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছি কারন আমরা কোন সাহায্য-সহযোগিতা চাইনা, চাই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

একই অনুষ্ঠানে কথা হয় পৌর এলাকার শাহেদনগড় মহল্লার শাকিলা বেগমের সাথে, অন্যের বাড়িতে কাজ করা শাকিলা জন্মের আগেই বাবাকে হারিয়েছেন স্বাধীনতাযুদ্ধে, বাবার মৃত্যুর সময় মায়ের গর্ভে থাকা শাকিলা এসেছেন তার বাবার রক্তেভেজা পতাকা হাতে। যে পতাকা কিনতে তাকেও পাচ-দশ টাকা করে সঞ্চয় করতে হয়েছে বেশ কয়েকদিন যাবৎ, তারপরও পতাকা হাতে চাই শাকিলার, কারন বাবাকে না দেখলেও জন্মের পর থেকে জেনে এসেছেন এই পতাকা আনতেই তার বাবাসহ এমন অনেককেই প্রান দিতে হয়েছে।

শহীদ শমসের আলীর মেয়ে শাকিলা বলেন, জন্ম থেকেই দুঃখ-কষ্টের মধ্যে বাস করছি, সরকার বা অন্য কেউ কোন খোজ রাখেনা। আমি শহীদ সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি চাই।

সিরাজগঞ্জের গনহত্যা অনুসন্ধান কমিটি’র সংগঠক ও সাবেক ছাত্রনেতা মঞ্জুর আলম শাহিন বলেন, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে এদের আপনজনেরা প্রান হারানোর পর অনেক কষ্ট, লাঞ্চনার মধ্য দিয়ে এরা বেড়ে উঠেছে, কেউ এদের খোজ-খবর নেয়নি, কোন সহায়তাও করেনি, এনিয়ে এদের মনে কিছুটা ক্ষোভ বা অভিমান থাকলেও এরাই স্বাধীনতার স্মৃতি বহন করছে। নিজেদের ভিতরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করছে, এরা বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকাটাকে কতটা ভালোবাসে, সন্মান করে তার প্রমান তাদের পতাকা কেনার এই ব্যাকুলতা।

গনহত্যা অনুসন্ধান কমিটি’র এই সংগঠক আরো বলেন, আমরা মুক্তিযোদ্ধা বা সাধারন সব শহীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন করছি পাশাপাশি দাবি জানাচ্ছি যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে দরিদ্র ও অসহায় শহীদ পরিবারগুলোকে পূনর্বাসন করা হয়।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments