জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে সিদ্ধান্ত নয়

image-84442ব্যাংকে আমানতের বিপরীতে আবগারি শুল্ক বাড়ানো যৌক্তিক নয় বলে মনে করেন সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তারা আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। সাংসদরা বলেন, সারা দেশে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এ অবস্থায় জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রীকে জেদ না ধরার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সাংসদরা এসব কথা বলেন। সরকারি দলের সাংসদ আবদুল মান্নান বলেন, বাজেটে বলা হয়েছেÑ উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ এবং সময় এখন আমাদের। এটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। ১৬ কোটি মানুষের জন্য এ বাজেট খুব বড় বাজেট নয়। যদিও বিরোধী পক্ষ থেকে বলা হচ্ছেÑ এটি অত্যন্ত বড় বাজেট। তিনি বলেন, স্থায়ী আমানতের বিপরীতে আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। সব এমপি এটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। সংসদ ও সংসদের বাইরেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এর আগে যে পরিমাণ শুল্ক কাটা হতো তা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। ৮০০ টাকা যদি শুধু আবগারি শুল্ক কাটা হয়, আরও অন্য চার্জও কাটা হয়। সে ক্ষেত্রে মূল টাকা কমে যায় কিনা, সে নিয়ে কথা উঠেছে। ব্যাংকে মানুষ অনেক খোঁজখবর নিচ্ছে। মানুষের মধ্যে সন্দেহ-সংশয় তৈরি হয়েছে। তাই এটি প্রত্যাহার করা উচিত। বর্ধিত আবগারি শুল্ক প্রত্যাহার করে এ সংশয় দূর করতে হবে। আবদুল মান্নান বলেন, বাজেট প্রস্তাবে এ বিষয়টি ওঠার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া হলেও অর্থমন্ত্রী তার পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে না আসার ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী সিলেটে বলেছেন, আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই। অর্থমন্ত্রীকে বলব এখানে জেদ করার কিছু নেই। আওয়ামী লীগ মানুষের জন্য কাজ করে। ভোটের রাজনীতি করে। তাই জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। নিত্যপণ্য ছাড়া বাকি সব পণ্যে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ না করে খাতভিত্তিক আলাদা হার নির্ধারণের প্রস্তাবও করেন আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, আমি ভ্যাটের পক্ষে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা এ নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছেন। এখানে ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসায়ী আছেন। আপনিও তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। মনে হয়েছিল এটি ১৫ শতাংশ না হয়ে ১৩ শতাংশ হবে। কিন্তু সেটি হয়নি। তবে যে হারে ভ্যাট বসানো হয়েছে তা বিবেচনার অনুরোধ জানাব। বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ইফতার পার্টির নাম করে খালেদা জিয়া প্রতিদিন যেভাবে মিথ্যাচার করছেন তাতে অবাক হই। খালেদা জিয়া বলেন, হাসিনা মার্কা কোনো নির্বাচন হবে না। তা হলে কি আগামীতে খালেদা জিয়া মার্কা নির্বাচন হবে? না, নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। তিনি আরও বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় যেতে চায় কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। দেড় বছর পর নির্বাচন হবে। এরই মধ্যে অনেক বিদেশি তৎপর হয়েছে। বার্নিকাটের সঙ্গে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের ইলেকশন কমিশন একমত পোষণ করেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে তারা গুরুত্ব দিয়েছে। সরকারি দলের আরেক সাংসদ একেএমএ আওয়াল (সাইদুর রহমান) বলেন, ব্যাংকে ১ লাখ টাকা থাকা খুব বড় বিষয় নয়। অনেক শ্রমজীবী মানুষেরই ব্যাংকে লাখ টাকা থাকতে পারে। এ ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি করা ঠিক হবে না। আমি দাবি করব সাধারণ জনগণের ওপর করের হার না বাড়িয়ে সিগারেটের মতো পণ্যে কর বৃদ্ধি করেন। এ ছাড়া এবারের বাজেট সুন্দর হয়েছে। তিনি বলেন, তৃণমূলের কথা বিবেচনা করে সব কিছুর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। আমানতের ওপর আবগারি শুল্কারোপের প্রস্তাব করা হয়েছে, আমি তা সমর্থন করি না। নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে এই বাজেটে এ অবস্থা আনা ঠিক হবে না। আবগারি শুল্ক প্রত্যাহারের অনুরোধ করছি। তা না হলে আমাদের দলের ওপর প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, একজন লোক জীবনে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেয়নি, সে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেল। জীবনে আওয়ামী লীগ করেনি, হঠাৎ শুনি আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে গেছে। তারা আবার শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটূক্তি করে। আজ আমাদের শপথ হোকÑ যারা শেখ হাসিনাকে কটূক্তি করবে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হবে। তিনি বলেন, বিএনপিকে অনুরোধ করব, শেখ হাসিনার কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করুন। দেশকে ভালোবাসুন, দেশের মানুষকে ভালোবাসুন। জাতীয় পার্টির মো. আবদুল মুনিম চৌধুরী বলেন, বাজেটের সফলতা বলতে আমরা বুঝি তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কিনা। জনগণ বোঝে কোন জিনিসের দাম কমল আর কোন জিনিসের বাড়ল। কিন্তু কোনো সময়ই বাজেট বাস্তবায়ন হয় না। সম্পূরক বাজেটের নামে সব সময় চলে লুটপাট। এবারও সে লুটপাট হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর শুল্কারোপ করা হয়েছে। এসব সাধারণ ও গরিব মানুষ ব্যবহার করে। ইমিটেশনের ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। যারা স্বর্ণ ব্যবহার করতে পারেন না তারা ইমিটেশন ব্যবহার করেন। অর্থমন্ত্রী সেটিও তাদের জন্য দুর্লভ করলেন। তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ও ব্যাংক লুটপাট করে ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী কিছুই করতে পারেননি। এত ভ্যাট, ট্যাক্স আর শুল্কারোপের পর এ বাজেট বাস্তবায়ন করা সম্ভব কিনা আমার সন্দেহ রয়েছে। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক বলেন, আমাদের দেশে সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন এগিয়ে চলেছে। গত ৮ বছরে এই সরকারের উন্নয়নে আমার নির্বাচনী এলাকাকে বদলে দিয়েছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে। তবে মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষকের অভাব রয়েছে। সরকারের এদিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। সংরক্ষিত নারী আসনের বেগম সানজিদা খানম বলেন, প্রতিটি জায়গায় উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নারী উন্নয়নে এগিয়েছি অনেক। পদ্মা সেতু আজ আর স্বপ্ন নয় বাস্তব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের দাবি পদ্মা সেতুর নাম ‘শেখ হাসিনা সেতু’ রাখা হোক। আওয়ামী লীগের ড. মো. শামসুল হক ভূঁইয়া বলেন, আবগারি শুল্ক কোনো নতুন কথা নয়। এটি বাস্তবায়নযোগ্য। এতে জনগণের কোনো ক্ষতি হবে না। ব্যক্তিগত আয়করের সীমা দেড়গুণ বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। মানুষের কল্যাণের বাজেট হিসেবে এবারের বাজেট পাস করা হোক। আলোচনায় আরও অংশ নেন সাংসদ আনোয়ারুল আজিম আনার, বেগম সেলিনা জাহান লিটা, গাজী ম ম আমজাদ হোসেন মিলন, বেগম শিরিন নাহিন ও বেগম কামরুন নাহার চৌধুরী এবং ওয়ার্কার্স পার্টির মোহাম্মদ ইয়াছিন আলী প্রমুখ।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.