দলীয় বিবেচনায় আরও ৭ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় আগে ১৯টি অনুমোদন পেয়েছে অনিয়ম ও সনদ বাণিজ্যে লিপ্ত কিছু বিশ্ববিদ্যালয় –

Du-sm-120130829053831রাজনৈতিক ও দলীয় বিবেচনায় এবার আরও সাতটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এগুলোর অনুমোদনের প্রস্তাব কিছুদিন আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। মহাজোট সরকারের আমলে ইতোমধ্যেই ১৯টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে সরকারি হিসাবে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ালো ৭১টি।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, সরকার বিদ্যমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠদানের মানই নিশ্চিত করতে পারছে না। নিশ্চিত হচ্ছে না প্রশাসনিক স্বচ্ছতা। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ১০/১২টি বিশ্ববিদ্যালয় দুর্নীতি, অনাচার ও সনদ বাণিজ্যে লিপ্ত। এই বেহাল দশার মধ্যে একের পর ঢালাওভাবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হলে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে তারা নিরুৎসাহিত হবে। শিক্ষা ব্যবসায়ীরা উৎসাহী হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সংবাদকে বলেছেন, শীঘ্রই আরও কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। তবে ঢাকায় আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হবে না বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে যেসব জেলায় কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই সেগুলোতে একটি করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়ার চিন্তাভাবনা আছে সরকারের। কোন শিক্ষা ব্যবসায়ীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হবে না বলেও মন্ত্রী জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাচ্ছে সেগুলোর একটি ঢাকায়। এর মধ্যে রাজধানীর পল্টনে ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শেখ কবির হোসেন।

রাজশাহীতে অনুমোদন পাচ্ছে নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, যার প্রস্তাবক হলেন অধ্যাপিকা রাশেদা খালেক। এই প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন পেতে চেষ্টা করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আবদুল খালেক। ঝালকাঠীতে অনুমোদন পাচ্ছে গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি, যার প্রস্তাবক হলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানকের সহধর্মিণী।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে অনুমোদন পাচ্ছে ‘রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়’, যার প্রস্তাব করেছে কুমুদিনী ট্রাস্ট। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রয়াত রণনা প্রসাদ সাহা।

জামালপুরে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে শেখ ফজিলাতুন নেছা ইউনিভার্সিটি, যার প্রস্তাবক হলেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজম।

এছাড়া কক্সবাজারে ‘কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’ যার প্রস্তাবক একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং নাটোরে ‘রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি’ অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ইউজিসি’র সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর নজরুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া উচিত নিয়মকানুন মেনে আবেদন যাচাই বাছাই করে ধীরেসুস্থে। তবে চাহিদা থাকলে এবং বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করছে কিনা তা বিবেচনায় নিয়ে বড় বড় শহরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রস্তাবিত স্থান, প্রয়োজনীয় শিক্ষক পাওয়া যাবে কিনা, ভৌত অবকাঠামো ও প্রস্তাবকারীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কেও খোঁজখবর নিতে হবে।’

এ বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিকদের সংগঠন ‘এপিইউবি’র সহসভাপতি আবুল কাসেম হায়দার সংবাদকে বলেন, ‘প্রয়োজনীয় শিক্ষক পাচ্ছি না, ভালো প্রফেসর পাচ্ছি না। তাতে একাডেমিক মানও রক্ষা করা যাচ্ছে না। আর ১০/১২টি বিশ্ববিদ্যালয় ইচ্ছামতো ক্যাম্পাস খুলে সার্টিফিকেট বাণিজ্য করছে, দুর্নীতি করছে কিন্তু সরকার কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এই পরিস্থিতির মধ্যে আরও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হলে সনদ বাণিজ্য ও দুর্নীতি আরও বাড়বে এবং বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা ধ্বংসের মুখে পড়বে’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন বেশি দরকার কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই শিক্ষার প্রতিষ্ঠার প্রতি সরকারের মনোযোগ নেই।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেতে আরও শতাধিক ব্যক্তি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনাসহ (ডিপিপি) জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে কালো তালিকাভুক্ত শিক্ষা ব্যবসায়ী, সরকারদলীয় সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, আদম ব্যবসায়ী, কালো টাকার মালিকও আছেন। তারা যেকোন মূল্যে অনুমোদন পেতে নিয়মিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদবির করছেন। কেউ কেউ সরকারদলীয় প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতা দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের কাছে সুপারিশও করাচ্ছে। এতে প্রায়ই বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যারা আবেদন করেছে তাদের আবেদন যাচাইবাছাই করে এগুলোর বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এতে দেখা গেছে, কালো তালিকাভুক্ত শিক্ষা ব্যবসায়ীকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিতে সুপারিশ করা হয়েছে।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.