দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী

1464787067উত্তরা থেকে ২০ কিলোমিটার পথ ৩৮ মিনিটে অতিক্রম করে যাত্রীদের মতিঝিলে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বহুল প্রত্যাশিত দেশের প্রথম মেট্রোরেল কর্মযজ্ঞের উদ্বোধন হলো। গতকাল রবিবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের আওতায় গাজীপুর থেকে শাহজালাল বিমানবন্দর পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) জন্য গাজীপুরে বাস ডিপো নির্মাণ কাজেরও উদ্বোধন করেন তিনি। ঢাকার যানজট নিরসন ও আধুনিক নগর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই দুটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

 

উল্লিখিত প্রকল্প দুটির নির্মাণ কাজের উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। তিনি বলেন, যেসব উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সেগুলো দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন               করে দেশের জনগণকে আমরা আরো সুন্দরভাবে চলাচলের সুযোগ করে দিতে সক্ষম হবো। ঢাকা শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা কীভাবে আরো উন্নত ও সহজ করা যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। তবে এটা ঠিক যে ঢাকায় অতিরিক্ত মানুষের বসবাস। কিন্তু যে পরিমাণ রাস্তাঘাট থাকার কথা তার অভাব রয়েছে। অপরদিকে মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হওয়ায় গাড়ি কেনার ক্ষমতাও বাড়ছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সবসময় মনে করে উন্নয়ন টেকসই হওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় উত্তরা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার এলিভেটেড মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ শুরু হলো। উত্তরা ৩য় পর্ব থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ২০১৯ সালে এবং সেখান থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০২০ সালে মেট্রোরেল চলবে।

 

প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীকে বলেন, যেন ২০১৯ সালেই প্রকল্পটি আগারগাঁও নয়, ফার্মগেট পর্যন্ত সম্পন্ন হয়। এতে সাধারণ মানুষের জন্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত আরো একটু সহজ হবে। শেখ হাসিনা বলেন, এ লাইনে মহানগরীর ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্টেশন থাকবে। এতে প্রতিঘন্টায় উভয় দিকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করবে এবং উত্তরা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত মাত্র ৩৮ মিনিটেই পৌঁছাতে পারবে। আজ থেকে এমআরটি লাইন-৬ এর নির্মাণ কাজ শুরু হচ্ছে। তিনি বলেন, এমআরটি-বিআরটি সম্পূর্ণরূপে পরিচালিত হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সমস্ত দেশজুড়েই সড়ক, মহাসড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার, পাতাল সড়ক, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রেল, নৌ-সহ যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক পদক্ষেপ হাতে নিয়েছি। ঢাকা শহরের পূর্ব-পশ্চিম অংশের সংযোগসহ একটি সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে স্ট্রাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্লান হাল-নাগাদ করা হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এর সুপারিশ অনুযায়ী এয়ারপোর্ট-খিলক্ষেত-বারিধারা-বাড্ডা-রামপুরা-মৌচাক হয়ে কমলাপুর এবং খিলক্ষেত-পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার এমআরটি লাইন-১ এবং গাবতলী-টেকনিক্যাল-মিরপুর-১, ১০ ও ১৪-বনানী-গুলশান-২ হয়ে ভাটারা পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার এমআরটি লাইন-৫ এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলমান রয়েছে। এমআরটি লাইন-১ এ ৯ কিলোমিটার এবং এমআরটি লাইন-৫ এ ৬ কিলোমিটার মোট ১৫ কিলোমিটার পাতাল রেল নির্মিত হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে এ দু’টি লাইনের কাজ শেষ হলে নগরীর বেশিরভাগ স্থানেই দ্রুত, সহজ ও আরামদায়ক পরিবেশে মানুষ যাতায়াত করতে পারবে। এতে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে। অন্যদিকে যানজটের কারণে অপচয় হওয়া থেকে কর্মঘন্টা সাশ্রয় হবে।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাজীপুরসহ আশপাশের জেলার জনগণের ঢাকা মহানগরীতে যাতায়াত সহজ, পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও দ্রুত করার জন্য গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বিআরটি লাইন স্থাপনের উদ্যোগ আমি গ্রহণ করি। এ প্রকল্পেরও নির্মাণ কাজ আজ শুরু হতে যাচ্ছে। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ডিসেম্বর সমাপ্ত হবে। আর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বাসভিত্তিক দ্রুতগামী এ গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রতি ঘন্টায় উভয় দিকে ২৫ হাজার যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ঢাকাস্থ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার বিআরটি লাইন-৩ নির্মাণের বিষয়টিও যাচাই করে দেখা হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকারের সময়ে দেশে ৫ হাজার ছোট ও মাঝারি সেতু এবং ১৪টি বৃহত্ সেতু নির্মাণের পাশাপাশি ২১ হাজার কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।

 

পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সকলেই জানি প্রায় ২৮ হাজার কোটি ঢাকা ব্যয়ে নিজস্ব অর্থায়নে বৃহত্তম নির্মাণ প্রকল্প পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এ সেতুর এক্সেস রোড হিসেবে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া ঘাট এবং অপর পাড়ে ভাংগা পর্যন্ত মোট ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়কের উভয় দিকে ধীর গতির যানবাহন চলাচলের জন্য পৃথক লেনসহ ৪ লেনে উন্নীতকরণের কাজ শুরু হয়েছে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হবে।

 

শেখ হাসিনা বলেন, পরিবহন সেক্টরে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন এবং জনসাধারণকে সেবা প্রদানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যানবাহনের কর ও ফি আদায়ে অন-লাইন ব্যাংকিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। ইলেক্ট্রনিক চিপযুক্ত ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার প্রতিশ্রুত ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে প্রতিটি পদক্ষেপ এক একটি মাইলফলক।

 

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুইচ চেপে মেট্রো রেল এবং মাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রজেক্টের ফলক উন্মোচন করেন। পরে এক বিশেষ মোনাজাতেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত মাসাতো ওয়াতানাবে, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এম. এ. এন সিদ্দিক প্রমুখ। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, কূটনৈতিক মিশনের সদস্যগণ, সরকারি, সামরিক ও বেসামরিক পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী দেশের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.