নির্বাচন আসন্ন : সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আশঙ্কা

আগামী জাতীয় নির্বাচনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অর্থাৎ দেশের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান নাগরিকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা করছেন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও মানবাধিকার কর্মীরা। সাম্প্রদায়িক কিছু ঘটনায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনকালীন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থেকে তারা এই আশঙ্কা করছেন। তারা বলছেন, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্বাচন সময়ে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, মন্দিরে আক্রমণ ও ভাঙচুর, নির্যাতন, সম্পত্তি দখল এবং নারীদের নিগ্রহের ঘটনা সেই পাকিস্তান আমল থেকে এ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবেই ঘটে আসছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় জাতীয় নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক সহিংসতার মূল টার্গেটে পরিণত হওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিদেশি কূটনীতিকদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর বিচারের রায়কে কেন্দ্র করে সারাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। আর ২৮ আগস্ট পর্যন্ত ৫১টি জেলায় ১৪৬টি মন্দির, ২৬২টি বসতবাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এতে পাঁচশ’ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ২১৯টি দোকানপাটে লুট, অগি্নসংযোগ করা হয়। এই সহিংস ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত হয়।
অন্যদিকে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মূল টার্গেট ছিল হিন্দু নাগরিকরা। সে সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলে হত্যা, ধর্ষণ, অগি্নসংযোগ, নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছিল তা নজিরবিহীন।
২০০১ সালের সহিংস ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত শাহাবুদ্দীন কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় : বরিশাল, ফরিদপুর, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ভোলা, যশোর, ঝিনাইদহ, নাটোর, রাজবাড়ী ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় নির্যাতন চালানো হয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে কমিশন জানতে পারে ওই সময় ১৮ হাজারেরও বেশি সহিংস ঘটনা ঘটেছিল। তবে সহিংস নির্যাতনের ঘটনার বেশিরভাগ কমিশনের পক্ষে তদন্ত করা সম্ভব হয়নি। প্রতিবেদনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের ২০০১ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০০২ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ৩ হাজার ৬২৫টি দুর্ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। সহিংসতার মধ্যে রয়েছে ৩৫৫টি রাজনৈতিক হত্যাকা- এবং ৩ হাজার ২৭০টি ধর্ষণ, গণধর্ষণ, অগি্নসংযোগ ও লুটসহ অন্যান্য ঘটনা। সারাদেশ থেকে কমিশনের কাছে অভিযোগ জমা পড়ে ৫ হাজার ৫৭১টি। এর মধ্যে থেকে ৩ হাজার ৬২৫টি সহিংস ঘটনা তদন্ত করে কমিশন।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২, ১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১ এবং ২০১৩ সালে বড় ধরনের সামপ্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর প্রতিটি ঘটনায় সহিংসতার প্রথম শিকার হয়েছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। অন্যদিকে ধর্মীয় ষ্পর্শকাতরতার অজুহাত দেখিয়ে কোন সরকারই প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের গবেষণা থেকে পাওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে হিন্দুদের ওপর প্রথম আঘাত আসে। অক্টোবর মাসে দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিন চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, ঢাকার শাঁখারীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও পূজাম-পে হামলা চালানো হয়। এই আক্রমণের মধ্যে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রদূত মনোরঞ্জন ধরের ময়মনসিংহের বাড়ির পূজাম-পটিও বাদ যায়নি। একাত্তর সালে রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে হামলা চালানো হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মন্দিরের ওই জায়গা ফেরত চাওয়া হয়। কিন্তু মন্দিরের ওই জায়গা আজও ফেরত দেয়া হয়নি। ১৯৯০ সালে ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙার মিথ্যা অজুহাতে দেশে তিনদিন ধরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চালানো হয়। ওই সময় ঢাকেশ্বরী মন্দির, জয়কালী মন্দির, শনির আখড়া, শাঁখরীবাজারের বিভিন্ন মন্দিরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় দেড় হাজার মন্দির ভাঙচুর করা হয়। ১৯৯১ সালে বিভিন্ন স্থানে খ্রিষ্টানদের চারটি গির্জায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার জের হিসেবে দেশে আবারও হিন্দুদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও মন্দির ভাঙচুর করা হয়। ২৭ দিন ধরে চলে এই সহিংসতা। ওই সময় প্রায় দুই হাজার মন্দির ভাঙা হয়। ২০০১ সালের পর ২০১১ সালে ইসলাম ও মহানবীকে (সা.) অবমাননার মিথ্যা অজুহাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন করা হয়। ২০১২ সালে পরিকল্পিতভাবে চট্টগ্রামের পাথরঘাটা, হাটহাজারী, সাতক্ষীরা, চিরিরবন্দর, রাঙ্গামাটি, রামুতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। শুধু পাথরঘাটায় তখন ভাঙা হয় ১৪টি মন্দির।
গত ২৩ আগস্ট গণভবনে হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে একশ্রেণীর রাজনৈতিক গোষ্ঠী ধর্মীয় সংখ্যালঘু লোকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়।
গত ৩০ আগস্ট ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডবিস্নউ মজিনা বলেন, আগামী কয়েক মাসে সংসদীয় নির্বাচনের কারণে রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। এজন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
মজিনা আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর যে আক্রমণ-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে তা বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার সম্পূর্ণ বিরোধী। এ আক্রমণ কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানদের ওপর রাজনৈতিক কারণে সহিংসতা চালানো সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষা্িবদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান সংবাদ’কে বলেন, গত এক বছর ধরে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও উপাসনালয় আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিমা, বিগ্রহ ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন কোথাও কোথাও উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত সংবাদ’কে বলেন, বাহাত্তর সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর প্রথম আঘাত আসার পর তৎকালীন সরকারকে দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এই ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, ২০০১ সালের সহিংসতার পর আমরা এই ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত করার দাবি জানিয়েছিলাম। ২০০৯ সালে এই সহিংস ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করে হাইকোর্টে মামলা করা হয়। পরে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী শাহাবুদ্দীন কমিশন গঠন করা হয়। শাহাবুদ্দীন কমিশনের প্রতিবেদনে ২০০১ সালের সহিংস ঘটনায় যারা জড়িত ছিল তাদের শাস্তি প্রদান এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু হামলার ক্ষেত্রে যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি চালু আছে তা থেকে দেশ যাতে বেরিয়ে আসতে পারে তার জন্য কিছু সুপারিশ করা হয়েছিল; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ২০১৩ সালের শেষ পর্যায়ে এসেও সেই প্রতিবেদন বাস্তবায়ন হয়নি।
আসন্ন নির্বাচন কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের রায়কে ঘিরে দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি কাজল দেবনাথ সংবাদ’কে বলেন, দেশ বা দেশের বাইরে যে ঘটনাই ঘটুক না কেন_ তার জের ধরে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক নির্যাতন, নিপীড়ন, মন্দির ভাঙা, দেবোত্তর সম্পত্তি দখল, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিনই একটি দু’টি মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে।
কাজল দেবনাথ বলেন, ১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১ এবং ২০১৩ সালের সহিংস ঘটনায় যখন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালানো হয় তখন সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলেছেন, ঘটনাগুলোকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। ২০০১ সালের সংখ্যালঘুদের হামলার ঘটনায় আমরা তৎকালীন সরকারের প্রধান বেগম জিয়ার সঙ্গে হাওয়া ভবনে দেখা করেছিলাম। মিডিয়াতে এই সহিংস ঘটনা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে একটি বিবৃতি দেয়ার জন্য তাকে অনুরোধও জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাদের অনুরোধ রাখেননি। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেনকেও অনুরোধ করেছিলাম সড়কপথে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করার জন্য। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা প্লেনে করে পরিদর্শন করে এসে মিডিয়াতে বললেন, ঘটনা অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। আসল সত্যকে এড়িয়ে এই অতিরঞ্জিত বলার প্রবণতা ২০১৩ সালেও আমরা লক্ষ্য করেছি।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, বর্তমান সরকারের গত চার বছরে সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় দেশের দুটি রাজনৈতিক দল একে অন্যের ওপর দোষারোপ করছে। এই সুযোগে মূল অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং দুর্গাপূজাকে নিয়ে আমরা শঙ্কিত। আশঙ্কা করছি যুদ্ধাপরাধের পরবর্তী রায়গুলো হলে এই নির্যাতন আরও ব্যাপকভাবে দেখা দেবে। জাতীয় সংসদে হিন্দুদের কোন প্রতিনিধিত্ব না থাকায় ও রাজনৈতিক কারণেই হিন্দু সমপ্রদায় বারবার আক্রান্ত হচ্ছে।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.