প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিনের ইন্তেকাল

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে সুন্দরবন অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। গতকাল শুক্রবার সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল হাসপাতালে মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। গত ১২ জুলাই গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর নেয়া হয়। এর আগে তিনি দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। তার দুটি কিডনি এবং লিভার ক্ষতিগ্রস্ত থাকা অবস্থায় হূদরোগে আক্রান্ত হন। তখন আইসিইউতে নিয়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত আড়াইটার দিকে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং দুপুরে মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ে, দুই ভাই ও এক বোন রেখে গেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন।

মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের পূর্ব পুরুষের বাড়ি পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ায়। আইনজীবী পিতা আফতাব উদ্দিন আহমেদের ছেলে জিয়াউদ্দিন ১৯৫০ সালে পিরোজপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তার আপন চাচাতো ভাই। পিরোজপুর সোহরাওয়ার্দী কলেজে স্নাতকে অধ্যায়নকালে তিনি ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের ২০ মার্চ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে ছুটিতে বাড়ি আসেন এবং ২৭ মার্চের পর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। প্রথমে তিনি পিরোজপুর শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন এবং সুন্দরবনে ঘাঁটি স্থাপন করে ১৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেন। এ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের অধীনে সাব সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হয়ে সুন্দরবনেই সদর দপ্তর স্থাপন করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা শুরু করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমে ক্যাপ্টেন ও পরে মেজর পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭৫ সালে ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বর পর পর দুটি সেনা অভ্যুত্থানকালে মেজর জিয়া সরকারি কাজে পিরোজপুর শহরে মুক্তিবাহিনী সদস্যদের পুলিশে ভর্তি জন্য পিরোজপুরে ছিলেন। পরে ঢাকায় ফিরে কর্নেল তাহেরের নির্দেশে জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ১৯৭১ সালের মতো ঘাঁটি স্থাপন করেন। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া মাঝের চরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে কর্নেল তাহেরসহ মেজর জিয়া এবং জাসদ নেতৃবৃন্দের বিচার হয়। এ বিচারে তাহেরকে ফাঁসি এবং মেজর জিয়াকে যাবজ্জীবনসহ অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। ১৯৮০ সালে তিনি সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পান এবং জাসদে যোগ দেন। ১৯৮৩ সাল থেকে তিনি সুন্দরবনে দুবলার চরে মাছের ব্যবসা শুরু করেন এবং জেলেদের আর্থিক নিরাপত্তা, জলদস্যু দমন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণসহ বিভিন্ন সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯৮৯ সালে পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার কিছু স্মৃতি গ্রন্থ রয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধে সুন্দরবনের সেই উন্মাতাল দিনগুলো’ ও ‘সুন্দরবন সমরে ও সুসময়’ যার মধ্যে অন্যতম।

মরদেহ ঢাকায় আসবে আজ রাতে

এদিকে, মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউদ্দিনের মরদেহ আজ শনিবার রাতে বিমানযোগে ঢাকায় আনা হবে। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সিঙ্গাপুর থেকে মরহুমকে নিয়ে তার বড় ভাই সালাহউদ্দিন আহমেদ, স্ত্রী কানিজ মাহমুদা পাপড়ী ও ছোট ছেলে জাহিদউদ্দিন আহমেদ অভিক বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হবেন বলে বড় ছেলে অনিরুদ্ধ জানিয়েছেন। ঢাকায় আনার পর রাজধানী ও জন্মস্থান পিরোজপুরে জানাজাসহ শেষ শ্রদ্ধা জানানো হবে মরহুমকে। তাকে কোথায় দাফন দেয়া হবে সে বিষয় পরিবারের সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেবেন।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.