রাজনীতিক তরিকুলের জীবনাবসান

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে উঠে আসা দাপুটে রাজনীতিক, সাবেক মন্ত্রী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ৭২ বছর বয়সী এই প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনিসহ নানা দুরারোগ্য জটিল রোগে ভুগছিলেন। রবিবার বিকাল ৫টায় রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
বিএনপির অন্যতম বিশ্বস্ত এই নেতার মৃত্যুর খবরে তার দল ও অনুসারীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। অনেক নেতা হাসপাতালে ছুটে যান শেষবারের মতো তাকে দেখার জন্য। হাসপাতালের সামনে নেতাকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। যশোরে দলের নেতাকর্মীরা তরিকুল ইসলামের যশোর শহরের ঘোপ সেন্ট্রাল রোডের বাড়িতে জড়ো হন। গোটা জেলা জুড়েই শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
তরিকুল ইসলাম স্ত্রী নার্গিস ইসলাম, দুই ছেলে অমিত ও সুমিতকে রেখে গেছেন। স্ত্রী নার্গিস ইসলাম শিক্ষকতা করেছেন যশোর সরকারি সিটি কলেজের বাংলা বিভাগে। বড় ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ড.কামাল হোসেন, এলডিপির সভাপতি অলি আহম্মেদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও তরিকুল ইসলামের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, গত ১১ দিন ধরে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। টানা ১১ দিন ধরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ১০ অক্টোবর তরিকুল ইসলামের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পুরান ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে ১২ অক্টোবর অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) রাখা হয়েছিল।
বর্ষীয়ান নেতা তরিকুল ইসলামের প্রথম জানাজার নামাজ সোমবার সকাল ১০টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর সোয়া ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজার দ্বিতীয় নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। বিকেলে ৪টায় যশোর ঈদগাহ মাঠে তৃতীয় জানাজার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোর শহরে জন্মগ্রহণ করেন তরিকুল ইসলাম। তার বাবা আব্দুল আজিজ ছিলেন ব্যবসায়ী। আর তার মায়ের নাম মোসাম্মৎ নূরজাহান বেগম। যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। পরে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। রাজনীতিতে হাতেখড়ি ছাত্রজীবনেই। বাম রাজনীতির ছাত্র ইউনিয়ন সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৬৮ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের জন্য রাজবন্দী হিসেবে দীর্ঘ ৯ মাস কারাভোগ করেন। যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজের শহীদ মিনার জরাজীর্ণ হওয়ায় ১৯৬২ সালে সহপাঠীদের শহীদ মিনার তৈরি করে পাকিস্তান সামরিক সরকারের রোষানলে পড়েন, গ্রেফতারও হন।
কারাগারে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে পরিচয়। সেই সূত্রে দীক্ষা বাম রাজনীতিতে। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী হিসেবে যশোর এমএম কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় গ্রেপ্তার হন।
১৯৭০ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন তরিকুল। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে নয় মাস ভারতে অবস্থান করেন। ১৯৭১ সালে চূড়ান্ত বিজয়ের পর তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। বাকশাল আমলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফোরামে বক্তব্য রাখার কারণে তরিকুল ইসলাম নির্যাতনের শিকার হন ও কারাবরণ করেন। ন্যাপ থেকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) হয়ে পরে বিএনপিতে যোগ দেন বরেণ্য এ রাজনীতিক। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির ৭৬ সদস্যের প্রথম আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন তরিকুল ইসলাম। সেই সঙ্গে বিএনপির যশোর জেলা আহ্বায়কের দায়িত্ব পান। ১৯৮০ সালে জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে পর্যায়ক্রমে তিনি দলের যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, ভাইস চেয়ারম্যান ও ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ পান।
আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত তরিকুল ইসলাম দলের বিভিন্ন সময়ের দুর্দিনে নেতৃত্বে পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন বলে তৃনমূলে নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তিনি বিএনপিতে প্রভাবশালী রাজনীতিক এবং খালেদা জিয়ার খুব বিশ্বস্ত ছিলেন।
১৯৭৩ সালে তরিকুল ইসলাম বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ শাসনামলে তরিকুল ইসলাম তিন মাস কারাভোগ করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে তিনি ফ্রন্টের হ্যাঁ/না নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। মরহুম মশিউর যাদুমিয়ার নেতৃত্বে ন্যাপ (ভাসানী) বিলুপ্ত হলে তিনি ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি গঠনে ভূমিকা রাখেন। যশোর সদর নির্বাচনী এলাকা (যশোর-৩) থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময়ে তিনি জাতীয়তাবাদী দলের জেলা আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮২ সালের ৫ মার্চ তরিকুল ইসলাম সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি এরশাদ কর্তৃক কারারুদ্ধ হন এবং দীর্ঘ তিন মাস অজ্ঞাত স্থানে আটক থাকেন। অতঃপর তথাকথিত এরশাদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসাবে দীর্ঘ নয় মাস ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ থাকেন এবং নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। জেলখানা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৮৬ সালে তাকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এ সময়ে তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৯০ এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি বিশেষ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর ১৯৯১-এর সংসদ নির্বাচনে তিনি সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ১৯৯৪ সালের উপ-নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালে তরিকুল ইসলাম সমাজকল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং ১৯৯২ সালে ওই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এ সময়ে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ওই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি প্রায় ৪০ হাজার ভোটের ব্যবধানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আলী রোজা রাজুকে পরাজিত করে যশোর-৩ আসনের এমপি নির্বাচিত হন। বিএনপির মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হলে তিনি সরকারের খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি তথ্য মন্ত্রণালয় এবং পরে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments