শহীদ মুকিতের রক্তমাখা জামা আঁকড়ে ধরে এখনো কাঁদেন তার ছোটবোন আফরোজা – মঞ্জুর আলম শাহীন


যখন দেশে কথা মনে পড়ে তখনই শহীদ এসএম আব্দুল মুকিত ভাইয়ের কথা মনে পড়ে আফরোজার। আর শহীদ ভাইয়ের কথা মনে হলেই ট্রাঙ্ক থেকে বের করে আনেন তার রক্তমাখা পায়জামা, পাঞ্জাবি। ভাইয়ের লেখা কলেজ জীবনের খাতা-পত্র। তারপর ডুকরে কাঁদেন, ভাইয়ের এসব স্মৃতিমাখা জিনিষগুলো আকড়ে ধরেন। তখনই ভাই যেন তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দেন। বলেন, তোমাদের জন্য একটি দেশ এনে দিয়েছি, ওই দেশের মধ্যেই আমাকে খুঁজে পাবে। ১৯৭১ সালের ২৬ এপ্রিল ধীতপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সংঘটিত গণহত্যায় শহীদ হন। বর্তমানে তিনি আমেনা মনসুর স্মরণীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। যুদ্ধ চলাকালে তিনি ছিলেন ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী।
স্কুল শিক্ষিকা আফরোজা ইয়াসমীন জানালেন- কৃষি নির্ভর মধ্যবিত্ত্ব পরিবার তাদের। তার বাবা এসএম বশারতউল্লাহ বিশা তখন ছিলেন শিয়ালকোল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব। শহীদ মুকিত ছিলেন পাঁচ ভাই দুই বোনের মধ্যে চতুর্থ। বাবা চাইতেন তার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় মনোযোগী হোক, নিজের পায়ে দাঁড়াক। শহীদ মুকিত ছিলেন মেধাবী ছাত্র, তাই তার উপরেই বাবা ভরসা করতেন সবচেয়ে বেশি। ১৯৭১ সালে মুকিত পড়াশোনা করতেন সিরাজগঞ্জ ইসলামিয়া কলেজে ইন্টামিডিয়েটে বিজ্ঞান বিভাগে। বাবা চাইতেন না যে তার কোনও ছেলে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়–ক, কিন্তু সেই উত্তাল দিনগুলিতে তার ছেলে মুকিত কলেজে ভর্তি হয়েই জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগের সঙ্গে। প্রতিদিনই মিছিল-মিটিংয়ে যেতেন, আর চেষ্টা করতেন বাবা যেন তার রাজনীতির কথা জানতে না পারেন। কিন্তু ভাই-বোনের সখ্যতার কারণেই প্রতিদিনের মিছিল-মিটিংয়ের গল্প করতেন ছোটবোন আফরোজার কাছে। যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন সিরাজগঞ্জ দখল করে নেয় তখন তিনি ঘাইটনা থেকে বাড়িতে চলে আসেন। পরিবারের সবাইকে বলেন, শহরের এতো কাছে বাড়িতে থাকা নিরাপদ না। চলো সবাইকে কোনও নিরাপদ গ্রামে রেখে আসি। এ কথা বলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে চলে যান ইছামতী গ্রামে। সেখানে এক আত্মীয় বাড়িতে পরিবারের সবাইকে রাখেন। এরপর সে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন হয়তো তার মিছিলের বন্ধুদের খোঁজে।
সিরাজগঞ্জে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৬ এপ্রিল গণহত্যা চালায় ধীতপুরের খেয়াঘাটে। তারপরের দিন আমাদের পরিবার খবর পায় যে, সেখানে আমার ভাই মুকিতকে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের লোকজন দিশেহারা হয়ে ছুটে যায় সেখানে। মুকিতকে বুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। মুকিতের লাশ পেয়ে সেখানেই একটি পাটক্ষেতের মধ্যে কবর দেওয়া হয়। চিহ্ন হিসেবে নিয়ে তার পরিবারের কাছে ফিরে আসে তার রক্তমাখা পাঞ্জাবি আর পায়জামা। কথাগুলো বলতে বলতে ঢুকরে কেঁদে ওঠেন আজকের আফরোজা ইয়াসমীন।
শহীদ মুকিতের বড় ভাই আব্দুল মতিন বলেন, আমার ছোট ভাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তিনি দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন এ জন্য আমরা গর্বিত। আমার ছোট ভাই শহীদ হওয়ার বিনিময়ে আমাদের পরিবারে চাওয়া বা পাওয়ার কিছুই নেই। আমার ভাই মুকিতকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হোক এটাই এখন আমাদের চাওয়া।
লেখক: সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির সদস্য।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.