শহীদ শামসুন্নাহার – সাইফুল ইসলাম

শহীদ

শহীদ

মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ভেঙ্গে গেলেও বাংলাদেশে এখনো পরিবারের প্রধান নারীই। আর সেই নারী যখন পরিবার থেকে হারিয়ে যায়, তখন পরিবারটি হয়ে পড়ে এলোমেলো, হাল ছাড়া নৌকার মতো। সেই নারী যখন সংসার থেকে হঠাৎ করেই অনুপস্থিত হয়ে যায়, তখন সে সংসারটা কী পরিমান টালমাটাল অবস্থায় পড়ে তা মাত্র ভুক্তভোগীরাই জানে। এমনি এক পরিবার শহীদ শামসুন্নাহারের পরিবার। তার স্বামী আজিজুল হক খান। বাড়ি সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার মিরপুর উত্তর পাড়ার খান বাড়িতে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা শহীদ শামসুন্নাহারকে ১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল হত্যা করে সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার পাশ্ববর্তী কুশাহাটা গ্রামে।

শহীদ শামসুন্নাহারের বড় ছেড়ে সাইফুল ইসলাম খান (৫২) জানান, তার বাবা আজিজুর রহমান খান চাকরি করতেন কওমী জুট মিলে। তারা মোট তিন ভাই ছয় বোন। বর্তমানে বাড়ি মিরপুর উত্তর পাড়া। তার বাবার দু’টি পক্ষ- স্বাধীনতা যুদ্ধের আগের পক্ষ আর পরের পক্ষ। যুদ্ধের আগের পক্ষের এক ভাই তিন বোন, সে, আমিনা, শাহিদা ও শীলা। যুদ্ধ যখন শুরু হয় তার বয়স ছিল মাত্র চার বছর আর ছোট বোনের বয়স তিন/চার মাস। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম দিকে সিরাজগঞ্জে পাকিস্তানি মিলিটারি ছিল না, ছিল পাকিস্তানি প্রশাসন। অসহযোগ আন্দোলনের ধাক্কায় সিএসপি অফিসার একে শামসুদ্দিনের নেতৃত্বে প্রশাসনের কর্মচারীরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ নেয়। শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। কিন্তু তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়। ঈশ্বরদীর অবাঙালিদের সহযোগিতায় ২৬ এপ্রিল দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৭ এপ্রিল ভোরে পাকিস্তানি হানদার বাহিনী সিরাজগঞ্জ দখল করে নেয়। ফলে আজিজুলের পরিবারকে শহর ছেড়ে আশ্রয় নিতে হয় কুশাহাটার গ্রামের নিকটাত্মীয় লুৎফর রহমানের বাড়িতে। পাক বাহিনী সিরাজগঞ্জ এসে ছড়িয়ে পড়ে শহরতলীর বিভিন্ন গ্রামে। হামলে পড়ে কুশাহাটায়ও। ফলে আজিজুলের পরিবার আবারো হয়ে পড়ে আশ্রয়হীন, নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে পরিবার পরিজন নিয়ে আবার ছুটতে থাকে আরেক আত্মীয় বাড়ি বহুলী ইউনিয়নের খাগা গ্রামের দিকে। কিন্তু দূর্বল শরীর নিয়ে পলায়মান মানুষের মিছিল থেকে পিছিয়ে পড়ে গৃহবধূ শামসুন্নাহার। ফলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে বিদ্ধ হয়ে আত্মাহুতি দিতে হয়। পাকিস্তানিরা হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে বিদায় নিলে স্বজনেরা তার মরদেহ খুঁজে বের করে। পরে তাকে দাফন করা হয় বহুলীর খাগা গ্রামে।

আজিজুল হকের আরেক ছেলে রাসেল খান পারিবারিক ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে শোনা আর দেখা কথা থেকে জানান যে, মা মরা ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বিপাকে পড়েন তার বাবা। দুধের বাচ্চা শীলাকে দেওয়া হয় তার এক চাচীর কাছে। আরো তিন শিশু সন্তানকে মানুষ করতে সাহায্য চাওয়া হয় শশুড় বাড়ির। শশুরের মধ্যস্থতায় আজিজুল হক বিয়ে করেন শহীদ সামসুন্নাহারের খালাতো বোন সিরাজগঞ্জের হোসেনপুর খলিফাপাড়ার আকবর আলী শেখের মেয়ে তাহমিনা খাতুনকে। পরে তিনিই শহীদ শামসুন্নাহারের সন্তানদের বুকে তুলে দেন এবং এ সংসারে নিজে দুই ছেলে এবং তিন মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন। জনাব রাসেল শামসুন্নাহারকে শহীদের এবং তাদের পরিবারকে শহীদ মর্যাদা দানের দাবি জানান।

সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments