শহীদ সাদেক আলী ও শহীদ হেকমত আলী

শহীদ সাদেক আলী ও শহীদ হেকমত আলী

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ আমাদের বাংলাদেশ। আর সে দেশের জনগণের ওপর এমনই বর্বর নির্যাতন শুরু করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে, প্রাথমিক অবস্থায় তাদের হাতে নিহত মানুষের মরদেহ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় কবরস্থ বা দাহ করাও ছিল কঠিন, একারনে অনেক শহীদের মরদেহকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে গণকবরে, কাউকে কাউকে কোনও রকমে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। এমনি দুই শহীদ পিতা-পুত্রের নাম শহীদ সাদেক আলী শেখ (৫০) ও শহীদ হেকমত আলী শেখ (২৮)। বাড়ি সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার সয়ধানগড়া গ্রামে।

শহীদ সাদেক আলী শেখের মেয়ে ধানগড়া গ্রামের আজাহার আলী রাজার স্ত্রী জমিরণ খাতুন (৭০) জানান, তার বাবা সাদেক আলীর ছোটখাট ব্যবসা করতেন। তাদের কয়েকটি রিকসাও ছিল। তার চার ছেলে দুই মেয়ে। ছেলেমেয়েরা হলেন- জমিরণ খাতুন, জুলেখা খাতুন, হেকমত আলী শেখ, আব্দুল হাকিম শেখ, কোরবান আলী শেখ ও জুলমাত আলী শেখ। অহসযোগ আন্দোলনের শুরু থেকেই সিরাজগঞ্জ মহুকুমা ছিল মুক্ত। ২৭ এপ্রিল পাকিস্তানিরা দখল করে নেয় সিরাজগঞ্জকে। তার কয়েকদিন আগে থেকেই নিরাপত্ত্বাহীনতার কারণে পৌর এলাকার লোকজন শহর থেকে পালাতে শুরু করে। সাদেক আলী শেখও পরিবার পরিজন নিয়ে আশ্রয় নেয় শহরের পাশ্ববর্তী বেড়াবাড়ী গ্রামে। কারণ সে গ্রামে মিলিটারির গাড়ি ঢোকার মতো কোনও রাস্তাঘাট ছিল না। কিন্তু প্রথম দিনেই মিলিটারিরা বাহিরগোলা রেল স্টেশনের কাছে গণহত্যা চালিয়ে ঢুকে পড়ে বিভিন্ন গ্রামে। একটি দল ঢুকে পড়ে বেড়াবাড়ী গ্রামেও। ফলে বেড়া গ্রামে শহর থেকে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া এবং সে গ্রামের লোকজন পালাতে শুরু করে। জীবন রক্ষার্থে পালাতে শুরু করে সাদেক পরিবারের লোকজনও। কিন্তু পরিবারের অন্যরা চলে যেতে পারলেও ধরা পড়ে সাদেক আলীর বড় ছেলে হেকমত আলী শেখ। তাকে ধরে নিয়ে মিলিটারিরা হত্যা করে ধীতপুর আলাল গ্রামে। পরে সেখান থেকেই তার রক্তমাখা কাপড়চোপর উদ্ধার করা হয়। এদিকে গুলিতে আহত হন সাদেক আলী শেখ। তার মুখে ও হাতে গুলি লাগে। সে অবস্থায়ই তিনি তার পরিবারের লোকজনকে খুঁজতে খুঁজতে চলে যান বহুলীর পাঁচ টিকরি গ্রামের দিকে। কিন্তু তিনি এতোই দূর্বল হয়ে পড়েন যে, নদীর মধ্যে তাকে পড়ে থাকতে হয়।

শহীদ কণ্যা জমিরণ খাতুন আরো জানান, খবর পেয়ে তার ছেলে আব্দুল হাকিম বাবাকে খুঁজে বের করে এবং পরিবারের কাছে নিয়ে যায়। তখন পরিবারটি বাড়ি ছাড়া এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত মানুষসহ কেউই তাদের আশ্রয় দিতে চাচ্ছিল না। কেউ কেউ এমনও বলেছে যে, এ আহত মানুষটি তো বাঁচবে না, তাই তাকে মাটি চাপা দিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপদ করাই ভালো। এসব কথা শুনে সাদেক আলীর মেয়ে ভীষন কান্নাকাটি করতে শুরু করে। পরে পরিবারটি শত ঝুঁকির মধ্যেও সিরাজগঞ্জ শহরে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। বহুলী এলাকা থেকে শিয়ালকোল হয়ে তারা ফিরে আসে বাড়িতে। সে বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে হয় মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত। আহত হওয়ার ১৭দিন পর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুকে বরণ করেন শহীদ সাদেক আলী শেখ। কিন্তু তার মরদেহ গ্রামে কবরস্থ করা সম্ভব হয়না জানাজানির ভয়ে। কোনও রকমে গোসল করিয়ে ধুতির কাপড়ে জড়িয়ে নিয়ে তাকে লুকিয়ে নিয়ে গিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয় কান্দাপাড়ার জঙ্গলের।

শহীদ সাদেক আলী শেখের নাতি বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম প্রহরী অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি, সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি মঞ্জুরুল আলম রুবেল বলেন, আমার দাদা ও কাকা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তাদের রাষ্ট্রীয় ভাবে শহীদের মর্যাদা দিয়ে তাদের অবদানকে স্বীকার করলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আন্দোলনই জোরদার হবে বলে আমি মনে করি।

সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments