শুল্ক কমানোর পর চাল আমদানি বাড়ছে


শুল্ক কমানোর ঘোষণা আসার পর বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি ব্যাপকহারে বাড়ছে। এ ঘোষণার আগে দিনে যেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ টন চাল আমদানি হতো সেখানে চলতি মাসে প্রতিদিন ১৫ হাজার টনেরও বেশি আমদানি হচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে বেশি পরিমাণে চাল আমদানি হওয়ায় ও সরকারি পর্যায়ে আমদানির ঘোষণার পর মজুদদার এবং মিলাররা তাদের চাল বাজারে ছাড়তে শুরু করেছে। ফলে বাজারে চালের সঙ্কট দূর হওয়ায় দামও কমতে শুরু করেছে। গত কয়েকদিন চালের বাজারের যে অস্থিরতা ছিল তা কমে স্বস্তি ফিরছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেখা গেছে, চলতি মাসের প্রথম চার দিনে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন চাল আমদানি হয়েছে। চালের বাজারের অস্থিরতা কমাতে গত মাসের ২০ তারিখে আমদানি শুল্ক কমানোর কথা ঘোষণা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। পরে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী চালের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এছাড়া ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটিও উঠিয়ে দেওয়া হয়। চাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের খবর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছালে ২২ জুন একদিনেই ১১ হাজার টন চাল আমদানি হয়।

নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার পরে চাল আমদানিকারকরা নতুন করে এলসি (ঋণপত্র) খুলছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগের চেয়ে বেশি এলসি খুলছেন ব্যবসায়ীরা।

সাধারণত, প্রতি বছর নতুন বোরো ওঠার পর চালের দাম কমে যায়। কিন্তু এবার উল্টো অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৪৬ টাকায়। গত বুধবার পর্যন্ত যা ছিল ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা পর্যন্ত।

হাওর অঞ্চলে অকাল বন্যায় ও দেশের কয়েকটি জেলায় ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে এবার বোরোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে। এরসঙ্গে যোগ হয়েছে বেসরকারিখাতে চাল আমদানি কমে যাওয়া। গত এক বছরে বেসরকারি খাতে মাত্র এক লাখ ৩৩ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। যেখানে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ দুই অর্থবছরে দেশে বেসরকারি খাতে প্রায় ৩০ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছিল।

এরআগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে চাল আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্কহার আরোপ করা হয়। চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) বাজেটে তা আরো ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়। এর সঙ্গে ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি মিলে এ শুল্কহার দাঁড়ায় ২৮ শতাংশে।

এদিকে সরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ভিয়েতনাম থেকে সরকারিভাবে আড়াই লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে। আগামী ১১ জুলাই এই চালের প্রথম চালানের চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা। দুই দফায় এ চাল আসবে। ভিয়েতনাম ছাড়াও আরও দুই লাখ টন চাল আমদানির জন্য চারটি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। দরপত্র অনুযায়ী, এ চাল আগামী এক মাসের মধ্যে দেশে আসবে। এর বাইরে সরকারি পর্যায়ে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে চাল আমদানির জন্য প্রক্রিয়া চলছে বলে খাদ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম নৌ-বন্দরের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়েও চাল আমদানি হচ্ছে। মূলত ভারত থেকে আমদানি হওয়া চাল স্থলবন্দর দিয়ে আসছে। শুল্ক কমার পর দেশের স্থলবন্দরগুলো দিয়েও চাল আমদানি বেড়ে গেছে। দিনাজপুরের হিলি স্থল বন্দরের বেসরকারি অপারেটর পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন মল্লিক বলেন, গত ৭ কর্মদিবসে এ স্থল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে প্রায় ১৭ হাজার টন চাল বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

এদিকে বেশ কিছু দিন ধরে অস্বাভাবিকভাবে দাম উঠার পর অবশেষে কমতে শুরু করেছে ধানের জেলা দিনাজপুরে চালের দাম। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজি প্রতি মোটা চালের দাম ৫ থেকে ৬ টাকা কমে আসায় অস্থির চালের বাজারে স্বস্তি ফিরে আসতে শুরু করেছে।

দিনাজপুর জেলার প্রধান চালের বাজার শহরের বাহাদুরবাজার এন, এ মার্কেটে গিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দেখা যায়, গত কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতিকেজি মোটা চালের দাম কমেছে ৫ থেকে ৬ টাকা। আর প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চাল কয়েক দিনের ব্যবধানে এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কম দরে।

তিনি আরও বলেন, গত কয়েক দিন আগেও দিনাজপুরে প্রতি বস্তা মোটা চাল দুই হাজার ৪০০ টাকা বস্তা বিক্রি হলেও এখন এক হাজার ৯০০ টাকায় নেমে এসেছে। বিআর-২৮ চাল বিক্রি হতো দুই হাজার ৫০০ টাকা, হাইব্রিড চাল বিক্রি হতো এক হাজার ৯০০ টাকা, আর প্রতিবস্তা মিনিকেট চাল বিক্রি হতো দুই হাজার ৬০০ টাকা দরে। কয়েক দিনের ব্যবধানে এখন এসব চালের দাম (চিকন) প্রতি বস্তায় কমেছে ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকা হারে।

খুচরা বাজারে দেখা যায়, প্রতিকেজি মোটা চাল ৪৪ টাকা ছিল। বর্তমানে ৩৮ টাকায় নেমে এসেছে। বিআর-২৮ চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা, মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৭ টাকা, গুটি স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি দরে। কয়েক দিন আগে এসব চাল বিক্রি হতো কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৪ টাকা বেশি দরে।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.