সিপিডির আলোচনা সভায় বিশিষ্টজন; নিরাপত্তার অভাবে টাকা পাচার হচ্ছে

untitled-9_220969অর্থ পাচার নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশিষ্টজন বলেছেন, বিনিয়োগের পরিবেশ ও নিরাপত্তার অভাবে দেশ থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা পাচার হচ্ছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনের দুর্বলতাও অর্থ পাচারের অন্যতম কারণ বলে তারা মনে করছেন। এই পাচার বন্ধে একটি টাস্কফোর্স ও স্বাধীন সংস্থা গঠনসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেন তারা।

গতকাল রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এ সভায় বক্তারা বলেন, এই অর্থ পাচার রোধ করতে হলে অবৈধ উপায়ে আয়ের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। সে সঙ্গে থাকতে হবে রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তাদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আশানুরূপ উন্নতি হচ্ছে না। এদিকে অর্থ পাচার বাড়ছে, যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। পাচারকারীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে তারা বলেন, শুধু আইন বা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ালেই অর্থ পাচার বন্ধ হবে না, তার সঙ্গে চাই সুশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নতি।

আলোচনা সভায় ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ অর্থ পাচার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিপিডি। সংস্থার রিসার্চ ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম এটি উপস্থাপন করেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্গ্নোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই) গবেষণা থেকে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সিপিডি। প্রতিবেদন প্রকাশের পর আলোচনায় অংশ নেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সাবেক সচিব, ব্যাংকার, আর্থিক খাতের বিশ্লেষকসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তারা। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন।

সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৮৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা চার লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মধ্যে অর্থ পাচার সবচেয়ে বেশি হয়েছে বাংলাদেশ থেকেই। সিপিডি বলেছে, বর্তমান সময়ে কেবল বাংলাদেশই নয়, সারা বিশ্বেই অর্থ পাচার অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দেশের ভেতরে টাকা রাখতে ভয় পান। এখানে নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। করহার কমলেও টাকা পাচার বন্ধ হবে না। অবৈধ উপায়ে আয়ের ছিদ্রগুলো (উৎস) বন্ধ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার ও দুদককে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। দুদকের সঙ্গে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নেই। তার সঙ্গে রাজনৈতিক অস্বস্তি ও অস্থিরতা তো আছেই। যত ভালো আইনই করা হোক না কেন, পরিবেশের উন্নতি না হলে টাকা পাচার বন্ধ হবে না। এটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ৮০ মণ স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে, ভালো কথা। খুশি হতাম অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে। তা তো চোখে পড়েনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বিদেশে গেছে, কিংবা পুঁজিবাজার থেকে আইপিওর মাধ্যমে টাকা তুলে খেয়ে ফেলেছে- এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

সাবেক সচিব ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ কালো টাকা। এর কিছু অংশ বাইরে যাবেই। টাকা পাচারের নেপথ্যে প্রভাবশালীরা জড়িত। এটি বন্ধ করতে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, সবাই জানে টাকা পাচার হচ্ছে। যারা করছে তাদের কেন সরকার ধরছে না, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। স্বর্ণ উদ্ধারের পর সে খবর ফলাও করে প্রচার করে এনবিআর। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীদের ধরা ও বিচার হয় না।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রাশেদ মাকসুদ খান বলেন, আমরা নিরাপদ নই। কর নীতি ও আর্থিক নীতিতে দুবর্লতা আছে। সমস্যা রয়েছে অবকাঠামো খাতে। বিনিয়োগের পরিবেশ ভালো না হলে দেশ থেকে টাকা পাচার বন্ধ হবে না।

টাকা পাচার বন্ধ করতে হলে প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিষেধক ব্যবস্থা নেওয়া এখন বেশি জরুরি- এ মত দেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

মেঘনা ব্যাংকের এমডি নুরুল আমিন বলেন, গত দশ বছরে রাজধানীর গুলশান, বনানীর ফ্ল্যাট ও জমি বিক্রির ৮০ ভাগ লেনদেন হয়েছে দেশের বাইরে। এরা কারা, তা খুুঁজে বের করা দরকার।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, যত কথাই বলি, সুশাসন কায়েম করতে না পারলে টাকা পাচার বন্ধ হবে না।

সাবেক অর্থ সচিব সিদ্দিকুর রহমান বলেন, টাকা পাচার রোধে অবৈধ আয়ের উৎসগুলো ঘুষ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দেশের মধ্যে ধনীদের টাকা রাখার জন্য সুযোগ যথেষ্ট অবারিত নয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দেশের শেয়ারবাজারে আনার পরামর্শ দেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মোহাম্মদ আলী রুমির মতে, আমাদের দেশের আইনে টাকা পাচার অপরাধ; কিন্তু যে দেশে টাকা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেখানে তো অবৈধ বলা হচ্ছে না। ফলে পাচারের টাকা ফেরত পাওয়া খুবই কঠিন।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও দুদকের সদস্য ড. নাসির উদ্দীন অভিযোগ করেন, টাকা পাচার নিয়ে যেসব সরকারি সংস্থা কাজ করছে, তাদের মধ্যে সমন্বয় নেই। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) পরিচালক আহসান হাবীব টাকা পাচার বন্ধে অফশোর ব্যাংকিংকে নিয়ন্ত্রণে আনার প্রস্তাব দেন। এনবিআরের অধীনে শুল্ক গোয়েন্দা দপ্তরের ডিজি ড. মইনুল খান মনে করেন, স্বর্ণ চোরাকারবারিদের সঙ্গে সন্ত্রাসে অর্থায়নের যোগসূত্র আছে। আইসিএবির সভাপতি কামরুল আবেদীন অর্থ পাচারসহ নানা অনিয়ম বন্ধে একটি অর্থবহ ও কার্যকর সংসদের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের যুগ্ম পরিচালক আবদুর রব, ডিজিএম কবির আহমেদ ও এনবিআরের সাবেক সদস্য আমিনুর রহমান, অধ্যাপক আইয়ুবুর রহমান ভুইয়া, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের সদস্য স্বপন কুমার বালা প্রমুখ।

প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে: জিএফআইয়ের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয় :এতে ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে ২০১২ ও ২০১৩ সালে। এর মধ্যে ২০১৩ সাল ছিল নির্বাচনের আগের বছর। এ সময়ে অর্থ পাচারের পরিমাণ ছিল ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার এবং ২০১২ সালে পাচার হয়েছে ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ ছাড়া ২০০৪ সালে পাচার হয় ৩৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০০৭ সালে ৪০৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০০৮ সালে ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ২০০৯ সালে ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ ডলার এবং ২০১১ সালে পাচার হয় ৫৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার। দেশ থেকে টাকা পাচার বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে সিপিডি বলেছে, নির্বাচনের প্রাক্কালে টাকা পাচারের পরিমাণ বাড়ে। এ ছাড়া দেশের ভেতরে অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা থাকলে এবং বিনিয়োগের সুযোগ না থাকলে তখনও টাকা পাচার বাড়ে।

সিপিডির হিসাবে ২০১৩ সালে পাচার হওয়া অর্থ দেশের শিক্ষা বাজেটের তুলনায় ৩ দশমিক ৬ গুণ বেশি, স্বাস্থ্য বাজেটের তুলনায় বেশি ৮ দশমিক ২ গুণ। পাচার হওয়া ওই অর্থের ২৫ শতাংশ হারে যদি কর পাওয়া যেত তাহলে স্বাস্থ্য বাজেট তিন গুণ এবং শিক্ষা বাজেট দ্বিগুণ করা সম্ভব হতো। সিপিডি তুলনা করে আরও দেখিয়েছে, ওই সময়ে পাচার হওয়া অর্থ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সাড়ে ৫ শতাংশ এবং ওই সময়ে বাংলাদেশের পাওয়া মোট বৈদেশিক সাহায্যের ৩৪০ শতাংশের সমান। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট পাচার হওয়া অর্থের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমদানি করা পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে অর্থ বাইরে পাচার করা হয়।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.