সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের হাসি যার আনন্দ

কিশোর কুমার দাস। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। যার ভালো লাগা সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মুখের হাসি; তাদের প্রতিষ্ঠিত করে স্বপ্নের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। কেবল নিজের ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে যিনি একের পর এক তৈরি করে যাচ্ছেন বঞ্চিত শিশুদের জন্য প্রকল্প। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের এক টাকায় আহার, বিনামূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম, এক টাকায় চিকিত্সা, এক টাকায় আইনী সহায়তা ও অনাথ শিশুদের জন্যে আশ্রম। আরো স্বপ্ন দেখছেন পথশিশুদের জন্যে পাঞ্চিং মেশিনের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ ও শিক্ষামূলক একটি ট্যাব তৈরির।

 

বয়সে তরুণ এই যুবক কি করে এতো কিছু করলেন, তার মুখেই শুনি সেই গল্প। কিশোর কুমার বলেন, বিদ্যানন্দের শুরুটা হয়েছিল ২০১৩ সালে। তারও আগে ব্যক্তিগত জীবনে হতাশা থেকে বিদেশ পাড়ি জমাই একটা কোম্পানির মাকেটিং এর প্রধান হিসেবে চাকরি নিয়ে। সেখানে ভালো বেতন। দেখলাম ছয় মাসের মধ্যে আমার টাকা বাড়তে শুরু করেছে। একদিকে আমার ব্যক্তিগত বিপর্যস্ত জীবন; অন্যদিকে আমি অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছি। হতাশা কিন্তু তখনো পিছু ছাড়েনি। আমি গরিব ঘরের সন্তান। বিদেশে থাকতাম একটা ১৩ তলা বিল্ডিং এর উপরে। সেখান জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখতাম, আর মনে মনে ভাবতাম- ‘এখান থেকে লাফিয়ে পড়লে কি হবে! আমি আসলে কিসের জন্যে বেঁচে আছি। তখনও আমার ভেতরে একাকিত্বটা এতোটা পেয়ে বসেছিল যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল। ভাবলাম আজ আর কাল হোক মরবোই তো; টাকা পয়সাগুলোর একটা সত্গতি করা দরকার। একসময় অনেক বলেছি, এইটা করবো, ওইটা করবো কিন্তু করা হয় নাই। কিন্তু দেশের বাইরে থেকে কিভাবে কি করবো! আমার বড় বোন আছে। বিয়ে করেননি। একটা ব্যাংকে চাকরি করেন। তাকে বললাম, ‘তোর যা টাকা লাগে আমি দিবো, তুই চাকরিটা ছেড়ে দে। বহু বোঝানোর পর তাকে রাজি করালাম। বড় বোনকে বললাম বাড়িতে গিয়ে পোলাপাইনদের ফ্রিতে পড়া। প্রথমদিন নারায়ণগঞ্জে শুরু হলো ২২ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম।

 

শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত কাজগুলোর মধ্যে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। একটার পর একটা প্রজেক্ট আসছে। তা করছি। দেখলাম পড়ার জন্যে বই লাগে। একটা লাইব্রেরি করা হলো। বই কেনা শুরু হলো। এটা একটা নেশার মতো হয়ে গেলো। লাইব্রেরি হয়ে গেলো। এরপর ঠিক হলো মাসে একটা করে জন্মদিনের পার্টি করা হবে।  সেখানে বাচ্চাদের খাওয়ানো হতো। একটা সময় দেখা গেলো এটা বেশি হচ্ছে। পরে মনে হলো, না এটা আর করা যাবে না। এই টাকায় বাইরে রাস্তা-ঘাটের শিশুদের খাওয়ানো হোক। আমরা বাইরে থেকে যে টাকা পাই তা দিয়ে খাওয়ানো শুরু হলো। তখন সেটার নাম হলো ‘এক টাকায় আহার’। কোনো প্ল্যান ছাড়াই। এ কাজগুলোতে আমি প্রথম দেড় বছর এক টাকাও কারো কাছে অনুদান নেইনি। আমার যা আছে তা দিয়েই হবে, কারো কাছে হাত পাতবো না। তখন বন্ধুরা বললো এটা ঠিক না, চ্যারেটি হলে অনুদান নিতে হবে। তখন বললাল, ঠিক আছে তোমরা যে যা পারো দাও। আমার বন্ধুরাও সবাই যে যার মতো করে অনুদান দেয়া শুরু করলো। এরপর থেকে টাকা আসতেই লাগল। আমাদের এখন বাত্সরিক বাজেট ২ কোটি টাকার মতো। এখানে অনেক মানুষ টাকা দেয় না। প্রতিমাসে মাত্র ২০০ মানুষ ২০ লাখ করে টাকা দেয়। তারা খুশি হয়ে এই টাকা দেয়। আমাদের এক স্বেচ্ছাসেবক আছেন, যিনি দুই মাসে ৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। তিনি এখানে কাজ করছেন।

 

কিশোর বলেন, সামনে কি করবো জানি না। তবে দুটো ইচ্ছা আছে- আমি একটা ফুড ব্র্যান্ডিং মেশিন চালু করতে চাই। যে কোনো বাচ্চা এটি দিনে একবার পাঞ্চ করে একবার ভাত পাবে। এটা এটিএম মেশিনের মতো। এটা বিদেশে আছে। আমি ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্র্যন্ডের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি ১০টা মেশিন বসাবো আমার টাকা দিয়েই। এটা আমার একটা প্ল্যান। দ্বিতীয়ত আমি গ্রামের বাচ্চাদের জন্যে একটা ট্যাব বানাতে চাই। সবগুলো শিক্ষণীয় ভিডিও থাকবে সেখানে। ইন্টারনেট দরকার পড়বে না। এটা এমন হবে। কোনো বাচ্চা ৭ম শ্রেণিতে উঠলে, তার জন্যে এই ট্যাব। সেখানে ৭ম শ্রেণির সবকিছু থাকবে। এটা একটা প্ল্যান আছে।

 

তিনি বলেন, আমি কোনো প্রতিশ্রুতি দিব না যে আমরা এটা করবো ওটা করবো। আমার রেজিস্ট্রার স্বেচ্ছাসেবক মাত্র ৬০০ জন। আমরা অনেক শর্ত মেনে স্বেচ্ছাসেবক নেই। আমরা অনুদানের পেছনে দৌড়াই না। আগ্রহী হয়ে অনেকে অনুদান দেয়। আমাদের দাতারা যে টাকা দেয়, সেই টাকা খরচের রশিদ আমরা তাকে দেই। আমরা সবাই সাধারণ কিন্তু আমরা একটা অসাধারণ টিম তৈরি করতে পেরেছি। আমাদের দুটি এতিমখানা আছে রাজবাড়ি ও রামুতে। আদিবাসীদের সবচেয়ে বড় এতিমখানা রামুতে।1497573028
লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.