স্যালুট : সাইফুল ইসলাম

13015618_1319397834743517_2034298028285205994_nভেতো বাঙালি, ভীতু বাঙালি; ভুখা বাঙালি- এসব শুনলে কোনো কোনো বাঙালি মুখ টিপে হাসে। ভাবটা এমন, তোমরা যতই ভেতো-ভীতু-ভুখা বলো, আমাদের তুলনা আমরাই। এটাই আমাদের জাত-বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ক্যাপ্টেন হাফিজের তা নয়। এসব শুনলেই মনে হয়, কেউ গালি দিচ্ছে। তখন তার মাথা গরম হয়ে যায়; খাড়া হয়ে পড়ে চান্দির চুল। যেমন মাথা গরম হয়ে চান্দির চুল খাড়া হয়ে গিয়েছিল ৩০ মার্চ।

সেদিন শীতকালীন মহড়া থেকে তড়িঘড়ি করে ফেরার ক্লান্তি নিয়ে অফিসার্স মেসে ঘুমিয়ে ছিলেন ক্যাপ্টেন হাফিজ। সকালেই তাকে ঘিরে ধরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈন্যরা। তারা জানায়, সেনাবাহিনীতে ‘ডিজআর্মড’ করা হয়েছে তাদের। পাকিস্তানিরা ভেবেছিল, কোর্টমার্শাল বা গুলি করার হুমকি দিলেই সবকিছু মেনে নেবে ভীতু বাঙালিরা। কিন্তু বাইরের উত্তাপে সেনানিবাসও যে গরম হয়ে উঠেছে, তা কল্পনাও করতে পারেনি পাকিস্তানিরা। বাঙালি সৈন্যরা এর প্রতিবাদে স্লোগান দেয়- ‘জয় বাংলা’। এ রণধ্বনি দিয়ে বিদ্রোহ করেই তারা সেখানকার বাঙালি অফিসার কর্নেল জলিলের কাছে যায়। কিন্তু তিনি রাজি হন না বিদ্রোহে। সেখান থেকে তারা আসে ক্যাপ্টেন হাফিজের কাছে। বলে, বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে হবে। বিদ্রোহী সিপাহিদের ইচ্ছেকে উস্কে দেন লেফটেন্যান্ট আনোয়ারও। হাফিজের নেতৃত্বে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে প্রায় দুইশ’ বাঙালি সৈন্য। যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে। তারা এসে ঘাঁটি গাড়ে মাশিলায়।

পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য চমৎকার জায়গা এই মাশিলা। গাঁয়ের পেছনে নোম্যান্সল্যান্ড; ওপারে ভারত। সেখানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ক্যাম্প। মাশিলা গাঁয়ের সামনে দিয়ে চলে গেছে যশোর রোড। রোডের দুই ধারে শতবর্ষী শিল-কড়ই গাছ, দুই পাশে দিগন্ত বিস্তৃত বিল। সেখানে প্রায় সারাবছর পানি থাকে; ফোটে শাপলা-শালুক। শুষ্ক মৌসুমে বিলপাড়ের জমিতে ধান-পাট-সর্ষে-কলাইয়ের আবাদ করে আশপাশের গাঁয়ের চাষিরা। পাকিস্তানি সৈন্যরা যদি মাশিলায় হামলা চালাতে চায়, তবে তা হবে তাদের জন্য আত্মহত্যার শামিল। কারণ, তাদের এখানে আসার একমাত্র রাস্তা ওই যশোর রোড। রোডের দুই ধারে কড়ই গাছগুলো এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে, তার আড়ালে এক বা দুইজন মুক্তিযোদ্ধা আড় নিয়ে এলএমজি থেকে গুলি চালাতে পারে অবিরাম। সে গুলি ভেদ করে এগিয়ে আসার সাধ্য শত্রু সৈন্যের বাপেরও নেই।

বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে মাশিলায় ঘাঁটি গাড়েন ক্যাপ্টেন হাফিজ। গাঁয়ের মানুষ একটি ফাঁকা বাড়ি ছেড়ে দেয় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। সেটাই হয়ে ওঠে হেডকোয়ার্টার। কিন্তু প্রথম দিনেই ওরা বুঝতে পারে, পেশাদার সেনাবাহিনীর যুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধ এক নয়। ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এসেছে এক কাপড়ে। সাথে রাইফেল, স্টেনগান আর এলএমজি; যার কাছে যা ছিল আর গুলি, যা পেরেছে সাথে নিয়ে এসেছে। এখন মনে হচ্ছে, যুদ্ধের জন্য আরও গুলি দরকার। কাপড়-চোপড়, খাদ্য তো নেই-ই।

সবাইকে ডাকেন ক্যাপ্টেন হাফিজ। দেখেন কমিশন্ড অফিসারের মধ্যে বেঁচে আছে একমাত্র তিনিই। আসার সময় পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন লেফটেন্যান্ট আনোয়ার। তাকে কবর দেওয়া হয়েছে হৈবতপুর গ্রামের পাশে নজরুল ইসলাম কলেজের সামনে। নন কমিশন্ড অফিসার পাওয়া গেল মোট ৯ জন আর প্রায় ২শ’ সৈনিক। হাফিজ বলেন, আমরা পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এসেছি। এখন বেতন, রেশন, কাপড়, ধোপা-নাপিত কিছুই পাওয়া যাবে না। দুপুরে খাব কী, তা এখনও জানি না। যে অবস্থা, তাতে এখন গোসল করলে থাকতে হবে ভেজা কাপড়ে। সামনে আরও অনেক কষ্ট করতে হবে আমাদের। এ কষ্টের বিনিময়ে পাব একটি স্বাধীন দেশ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে কাউকে বাধ্য করা যায় না। নিজের ইচ্ছায় যোগ দিতে হয়। তাই আমি সবাইকে সুযোগ দিচ্ছি- যারা এ যুদ্ধে শরিক হতে না চাও, তারা এখনই চলে যেতে পার।

সবাই উচ্চ স্বরে হাফিজের কথার জবাব দেয়- না না। আমরা কিছুই চাই না; দেশের স্বাধীনতা চাই।

-ঠিক আছে, সবাই যার যার সেকশন প্লাটুন গঠন করে নাও, কমান্ডার নিযুক্ত কর। আমরা লড়ব দেশের জন্য- ‘জয় বাংলা।’ সভা শেষ করেন হাফিজ।

এর পর শুধু নন কমিশন্ড অফিসারদের নিয়ে বসেন হাফিজ। প্রথমেই আলোচনা ওঠে খাদ্য সমস্যা নিয়ে। হাবিলদার মাইনুল উঠে বলেন, স্যার, আমি খাদ্য জোগাড়ের দায়িত্ব নিচ্ছি। সন্ধ্যা পর্যন্ত আপনাদের না খেয়ে থাকতে হবে।

-কীভাবে খাদ্য জোগাড় করবে?

-এখনও পাকিস্তানি সৈন্যরা আসেনি এদিকে। সাধারণ মানুষকে নিয়ে আন্দোলন করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। আমি মহেশপুর বাজারে গিয়ে নেতাদের বলব সমস্যার কথা। উনারা চেষ্টা করবেন নিশ্চয়। খাদ্য কোনো সমস্যা নয়; আমাদের দরকার অস্ত্র, গোলাবারুদ। আপনি বিএসএফের কাছে দেখুন কিছু অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া যায় কি-না? তবে কিছু কাপড়-চোপড় লাগবেই। কাপড় পাল্টাতে অন্তত গামছা তো দরকার। বলেন মাইনুল।

-ওটাও মনে হয় হয়ে যাবে। একটু ধৈর্য ধরতে হবে। জনগণ তো আমাদের সাথে আছে।

সবাইকে ডিফেন্স গড়ে তোলার কাজে পাঠানো হয়। আরও একজন সাথে দিয়ে মাইনুলকে পাঠান মহেশপুর বাজারে। নিজে বের হন ডিফেন্স দেখার জন্য।

গাঁয়ের মানুষ বাঙ্কার-ট্রেন্স খুঁড়তে সহায়তা করছে মুক্তিযোদ্ধাদের। গ্রাম থেকে এনে দিচ্ছে বাঁশ-কাঠ-দড়ি। সকালে নাশতার জন্য বিভিন্ন বাড়ি থেকে কয়েক টিন মুড়ি আর কয়েক হাঁড়ি ঝোলগুড় এনে দিয়েছে গাঁয়ের মানুষ। তাই খেয়ে কাজ করছে সবাই। এখানে একাকার হয়ে গেছে মুক্তিযোদ্ধা আর গাঁয়ের মানুষ। সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে স্বাধীনতার জন্য। গ্রামের বউ-ঝিরা দেখতে এসেছে মুক্তিযোদ্ধাদের। তারা ঘোমটা খুলে হেসে কথা বলছে তাদের সাথে, যেন কত দিনের আত্মীয়। ক্যাপ্টেন হাফিজ ভাবেন, এরই নাম জনযুদ্ধ। একজন এসে খবর দেয় হাফিজকে- ওপার থেকে আপনার সাথে কথা বলতে এসেছেন কয়েকজন সাংবাদিক।

-ওদের হেডকোয়ার্টারে বসাও, আমি আসছি।

হেডকোয়ার্টারে ফিরে আসেন হাফিজ। দেখেন কলকাতা, দিলি্লর শুধু নয়; একজন ব্রিটিশ সাংবাদিকও এসেছেন। বিএসএফের দুই সদস্য ওদের সাথে করে নিয়ে এসেছে। হাত মেলানো পর্ব শেষে হাফিজ বলেন, আমি বিএসএফ বন্ধুদের সাথে আগে কথা বলব।

-ও, শিওর; ভারতীয় সাংবাদিক বলেন। হাফিজের কাছে চলে আসে বিএসএফ সদস্যরা। স্যালুট করে বলে, সীমান্তের ওপারে ৭২ বিএসএফের ক্যাম্প। ক্যাম্পের কমান্ডার আপনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আপনার সাথে দেখা করার জন্য গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন তিনি।

-আমাদের এ সংগ্রামে আপনারা যে পাশে দাঁড়িয়েছেন, এ জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু ডিফেন্স ছেড়ে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি বরং আপনাদের সাথে একজনকে পাঠাব, তিনি যেন কিছু মনে না করেন। আপনাদের কাছ থেকে কিছু গোলাবারুদ চাইব। যদি উনি পারেন তবে যেন সাহায্য করেন।

-ইয়েস স্যার। জবাব দেয় বিএসএফ সদস্যরা।

ক্যাপ্টেন হাফিজ সুবেদার মজিদকে ডাকেন। কী কী গোলাবারুদ প্রয়োজন তার একটা লিস্ট করতে বলেন তাকে। বিএসএফ সদস্যদের বসতে বলে সাংবাদিকদের দিকে মনোযোগ দেন হাফিজ। সাংবাদিকরা এসে ঘিরে ধরেন তাকে। কলকাতার সাংবাদিক বলেন, আপনারা তো ভীতু বাঙালির মুখ উজ্জ্বল করে দিয়েছেন মশায়। যেভাবে লড়ছেন, তাতে মছুয়া খানেরা আর বেশি দিন টিকবে না বাংলাদেশে।

-প্রার্থনা করবেন- আমরা যেন হানাদারমুক্ত করতে পারি দেশকে। এ কথা বলে হ্যান্ডশেক করতে শুরু করেন হাফিজ। সাংবাদিকরা তাদের পরিচয় দেন, লন্ডনের ডেইলি এক্সপ্রেসের রবার্ট জেমস, দিলি্ল থেকে প্রকাশিত স্টেটসম্যানের মি. চ্যাটার্জি। সবশেষে হাত মেলান কলকাতার দৈনিক কালবেলার অরুণ দত্ত। হাফিজ তাদের বলতে থাকেন পাকিস্তানের শোষণ-নির্যাতন, বাঙালির ধারাবাহিক আন্দোলন, সর্বশেষ বিদ্রোহের কথা। নিজের কথায় নিজেই অবাক হয়ে যান হাফিজ। নিজেকে রাজনীতিবিদ মনে হয়, অথচ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে কখনোই রাজনীতি তাকে টানেনি। ফুটবল মাঠই ছিল তার ঘরবাড়ি। সাংবাদিকরাও তার কথা মুগ্ধ হয়ে শোনেন। টেপ রেকর্ড করেন সেসব কথা। সেই সাথে ক্যাপ্টেন হাফিজের অনেক ছবি তুলে নেন। সাক্ষাৎকার ও ছবি তোলা শেষে সাংবাদিকদের ডিফেন্স ঘুরিয়ে দেখান ক্যাপ্টেন। এক সময় বিদায় জানান সাংবাদিকদের। সাংবাদিকদের সাথে হাফিজ যখন কথা বলছিলেন, তখনও ঘিরে ছিল গাঁয়ের মানুষ। কেউ কেউ অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলছিল, আবার কেউ ডিফেন্স ঘুরে ঘুরে দেখছিল। সাংবাদিকদের বিদায় করতেই হাফিজকে ঘিরে ধরে গাঁয়ের মানুষ । মাতবর কলিমুল্লা মুন্সী এগিয়ে আসেন- স্যার, গাঁয়ের ছেলেরা আপনাগের জন্যি বাড়ি বাড়ি থেকে কিছু চাল-ডাল, লাউ-কুমড়া তুলেছে। খিচুড়ি রান্না করে খাওয়াতি চায় ওরা। যদি অনুমতি দেন…

-দুপুরে কী খাব তা তো এখনও জানি না। এটা হলে তো ভালোই হয়। যান, নিয়ে আসতে বলেন।

-নিয়ে আসছি স্যার। আর যে কোনো দরকার হলিই কবেন। খুব খুশি হবে গাঁয়ের মানুষ।

-আপনাদের সমর্থন না পেলে কি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়ার সাহস পেতাম আমরা?

-ঠিক আছে স্যার। ছেলেদের নিয়ে গ্রামের দিকে দৌড়ান কলিমুল্লা মুন্সী।

নানা ব্যস্ততার মধ্যে সময় বয়ে যেতে থাকে হাফিজের। দুপুরে যুবকরা খিচুড়ি নিয়ে আসে। কলাপাতা পেতে দিয়ে যত্ন করে খাওয়ায় সবাইকে। খেয়েদেয়ে ডিফেন্সে ফিরে যায় সবাই। খালি চৌকি পেয়ে তার ওপর একটু গড়িয়ে নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন হাফিজ।

কমান্ডারকে এভাবে খালি চৌকির ওপর ঘুমাতে দেখে তাজ্জব বনে যায় গাঁয়ের মানুষ। এক বৃদ্ধা এটা দেখে তার কিশোরী নাতনিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। কাঠের বাক্সের মধ্যে তুলে রাখা একটি নতুন কাঁথা নিয়ে ফিরে আসেন আবার। হাফিজ ঘুম থেকে উঠেই দেখেন এক বৃদ্ধা তার নাতনিকে নিয়ে বসে আছেন ঘরের দোরগোড়ায়। তিনি বের হতেই বৃদ্ধা ও নাতনি তার পথ আগলে দাঁড়ান। বৃদ্ধা বলেন, বাবা, তুমি খালি চৌকির উপর শুয়ে আছ দেখে খুব কষ্ট হ’লো। তাই নতুন কাঁথাটা আনছি। তুমি যদি এটা ন্যাও তাহলি খুব খুশি হবো।

বৃদ্ধার কথা শুনে চোখে পানি আসে হাফিজের। কাঁথাটি হাতে নিয়ে পরম যত্নে গায়ে জড়িয়ে নেন। বলেন, মা, আপনি আমাকে ভালোবেসে কাঁথাটা দিয়েছেন, আর নেব না? যতদিন দেশ স্বাধীন না হবে ততদিন এ কাঁথা গায়ে জড়িয়ে রাখব। যুদ্ধের ময়দানে যদি মরতে হয় তবে যেন এ কাঁথা গায়ে দিয়েই মরতে পারি- দোয়া করবেন।

বৃদ্ধা ভয় পেয়ে মুখে হাত দেন। বলেন, না মরবা না। তুমরা জিতবা। না হলি দেশ স্বাধীন হবে কীভাবে? হাফিজ বৃদ্ধার সামনে মাথা নত করেন। সেই মাথা ছুঁয়ে দোয়া করেন বৃদ্ধা। নাতনিকে নিয়ে হাঁটা দেন গাঁয়ের পথে।

ক্যাপ্টেন হাফিজ গাঁয়ের লোকজনকে বিদায় করে চলে আসেন ডিফেন্সে। বাঙ্কার-ট্রেন্স আবারও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। সামনে যশোর রোডটা দেখেন মনোযোগ দিয়ে। কারণ এ পথেই আসতে পারে পাকিস্তানিরা। রোডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বিশাল গাছও অতন্দ্র প্রহরীর মতো স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। তাই অত ঘাবড়ানোর কিছু নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। দেখেন, দূরে যশোর রোডের পাহারায় থাকা সিপাহি আজমল দৌড়ে ডিফেন্সের দিকে আসছে। সবাইকে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দেন হাফিজ। নিজেও একটু আড় নিয়ে দাঁড়ান। সামনে কড়ই গাছকে আড় করে এলএমজি বসান হাবিলদার হাবিবুর রহমান। হাঁপাতে হাঁপাতে ডিফেন্সে আসে আজমল। বলে, একটা ট্রাক্টর আসছে এদিকে।

বায়নোকুলার চোখে লাগিয়ে দূরে দৃষ্টি দেন ক্যাপ্টেন হাফিজ। ভাবেন, পাকিস্তানি সৈন্যরাই এদিকে আসছে না তো! কিন্তু এখন ওরা এদিকে আসার সাহস পাবে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া ট্রাক্টর নিয়ে আসবে কেন ওরা! ওরা এলে তো সাঁজোয়া বহর নিয়ে আসবে। তাই ঘাবড়ান না হাফিজ। ধীরে ধীরে ট্রাক্টর এসে দাঁড়ায় ডিফেন্সের সামনে। বনেট থেকে লাফিয়ে নামেন হাবিলদার মাইনুল। স্টার্ট বন্ধ করে নেমে আসে চালকও। মাইনুল বলেন, স্যার, কুড়ি বস্তা চাল আর দুই বস্তা ডাল নিয়ে এলাম।

-কোথা থেকে নিয়ে এলে? কাউকে ভয় দেখিয়ে আনোনি তো?

-না স্যার। মহেশপুর বাজারের সংগ্রাম কমিটিকে বললাম। তারাই খাদ্য গুদাম থেকে চালগুলো বের করে দিল। আর বাজার ব্যবসায়ী সমিতি বিভিন্ন দোকান থেকে এই দুই বস্তা ডাল তুলে দিল। এই আলী মিয়া খুবই চটপটে। বলল, আমি চালগুলো আমার ট্রাক্টরে দিয়ে আসি?

আলী সামনে এসে মিলিটারি কায়দায় স্যালুট জানায়। বলে, খাবারের জন্যি কোনো চিন্তা করবেন না স্যার। আমি আর আমার এই ট্রাক্টরই আপনাগের খাদ্য এনে দেব। দরকার হলি বাড়ি বাড়ি থেকে মুষ্টির চাল তুলে আপনাগের খাওয়াব। আপনারা আমাদের দেশটা স্বাধীন করে দেন।

আলীর কাঁধে হাত দিয়ে হাফিজ জিজ্ঞেস করেন, তোমার বাড়ি কোথায়?

-ওই মহেশপুর বাজারের কাছেই।

-ঠিক আছে। গাঁয়ের লোকজন আমাদের জন্য খিচুড়ি রান্না করে দিয়েছে। তোমরাও খেয়ে নাও। ততক্ষণে চালগুলো নামিয়ে নিচ্ছি।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। ইতিমধ্যে চাল-ডাল নামিয়ে দিয়ে ট্রাক্টর নিয়ে চলে গেছে আলী মিয়া। কিন্তু এখনও ফেরেননি সুবেদার মজিদ। এ নিয়ে চিন্তা হচ্ছিল হাফিজের। কারণ বিএসএফ কোনো সাহায্য করবে কি-না তা বোঝা যাচ্ছিল না। ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত বিএসএফ আসলে কোনো সাহায্য করতে পারবে না। কোথাও কোথাও অবশ্য বিএসএফ কমান্ডাররা নিজেদের সিদ্ধান্তে সাহায্য করছে। এসব ভাবতে ভাবতে হেড কোয়ার্টারে ফিরে আসেন হাফিজ। গাঁয়ের মানুষ একটি নড়বড়ে টেবিল আর গোটা তিনেক চেয়ার দিয়ে গেছে। হাফিজ তার একটি চেয়ারে বসে গা এলিয়ে দেন।

ক্যাপ্টেন ঘর্ঘর শব্দ শুনতে পান পেছন থেকে। ঘাড় ঘুরিয়ে ক্যাম্পের সামনে থামতে দেখেন একটি জিপ গাড়ি। সে গাড়ি থেকে নামেন সুবেদার মজিদ। উঠে সেদিকে এগিয়ে যান ক্যাপ্টেন হাফিজ। গাড়ি থেকে নামেন সাদা পোশাকের এক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা। মাথার পাকা চুল, সৌম্য চেহারার এ কর্মকর্তাকে দেখেই হাফিজ বুঝতে পারেন- ইনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বর্তন কেউ। তাকে স্যালুট জানান ক্যাপ্টেন হাফিজ। স্যালুটের উত্তর না দিয়ে হাফিজকে জড়িয়ে ধরেন কর্মকর্তা। স্পষ্ট বাংলায় পরিচয় দেন- আমি বাঙালি। ব্রিগেড মেজর শংকর রায় চৌধুরী; তোমাকে দেখতে এসেছি। কিছু গোলাবারুদ এনেছি তোমার জন্য। ওরা নামিয়ে নেবে, চলো তোমার সাথে দু’দণ্ড বসি।

শংকর রায় চৌধুরীকে হেড কোয়ার্টারে নিয়ে আসেন হাফিজ। বসতে দেন তার নড়বড়ে চেয়ারে। নিজে আরেকটি ভাঙা চেয়ার নিয়ে বসেন তার সামনে। কোনো রাখঢাক না করেই শংকর চৌধুরী বলেন- জানো, ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ‘ভেতো বাঙালি’ বলে বাঁকা চোখে দেখা হতো আমাদের। তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালিদের জাতে তুলেছে। এখন আমাদের শ্রদ্ধার চোখে দেখছে শিখ-রাজপুতরাও। এ জন্য আমি তোমাকে স্যালুট করতে এসেছি, ক্যাপ্টেন। উঠে দাঁড়াতে নেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড মেজর শংকর রায় চৌধুরী।

আবেগে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ান ক্যাপ্টেন হাফিজ। জড়িয়ে ধরেন শংকর রায় চৌধুরীকে। ভেজা গলায় বলেন, আপনি দোয়া করবেন স্যার। আমরা যেন সারাবিশ্বের বাঙালিদের নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.