হাইকোর্টের অভিমত: রাজনৈতিক দলগুলো উচ্ছৃঙ্খল কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল

1445931354দেশের রাজনৈতিক দলগুলো উচ্ছৃঙ্খল কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উচ্ছৃঙ্খল কর্মীদের পরিহার করার প্রবণতা দেখা যায় না। বরং অনেকাংশে তারা এদের ওপর নির্ভরশীল, যা দেশে সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিরাট অন্তরায়। সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ না ঘটলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। মুখ থুবড়ে পড়বে গণতন্ত্র।

টঙ্গীর জনপ্রিয় রাজনীতিক আহসানউল্লাহ মাস্টার এমপি হত্যা মামলায় দেওয়া রায়ের অভিমতে এ মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার এ মামলায় রায় দেন।

রায়ের অভিমতে আদালত বলেন, যে হত্যাকাণ্ডটি কেন্দ্র করে এই ডেথ রেফারেন্স আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে নিঃসন্দেহে এটি জঘন্যতম ঘটনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড অতীতে খুব কমই সংঘটিত হয়েছে। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ স্কুলে সংঘটিত ঘটনা প্রবাহ থেকে সম্মক উপলব্ধি করা যায়।

আদালত বলেন, ‘আমাদের সংবিধান ও অন্যান্য আইন অনুযায়ী একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে মানুষের চাওয়া-পাওয়া ও বিভিন্ন রকম দাবি মেটানোর তথা মানুষের কল্যাণে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য। সুচারুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার থাকে সেই রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দলটির সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। সংসদ সদস্যরা বা দলের উচ্চপর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে দেখা যায়। বিপরীতভাবে এও বলা চলে—স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাই তাদের সমর্থন ও কর্মকাণ্ড দিয়ে দলের উচ্চপর্যায়ের নেতাদেন পরিচালিত করে থাকে।

আদালত বলেন, জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল ইসলাম সরকারের সঙ্গে তখনকার সময়ের সদ্য ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন এবং আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা মাহফুজুর রহমান মহলের যতটুকু না ছিল রাজনৈতিক বৈরিতা তার চেয়েও বেশি ছিল অর্থনৈতিক সংঘাত। উভয়েই স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে দেখা যায়, উভয়ের মধ্যে স্থানীয়ভাবে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রতিযোগিতা চলছিল। মহলের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলেও তিনি নুরুল ইসলাম সরকারের নিরবচ্ছিন্ন মাদক ব্যবসায় বাধা সৃষ্টি করেছিলেন, এ কারণে নুরুল ইসলাম সরকার ও সঙ্গীরা মহলকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।

আহসানউল্লাহ মাস্টারকে পরিকল্পিতভাবেই হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে আদালত বলেন, ঘটনার ১০-১২ দিন আগে আসামিরা নুরুল আমিনের বাড়িতে বসে মাহফুজুর রহমান মহলকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। এটা পরিষ্কার অভিযুক্তরা জানতেন নিকট ভবিষ্যতে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে এবং সেখানে মাহফুজুর রহমান মহলসহ অনেকেই আসবেন এবং মহলকে সেখানেই হত্যা করা হবে বলে তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এটি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এ রকম সম্মেলনে স্থানীয় সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ আরো নেতারা উপস্থিত থাকবেন এটি ষড়যন্ত্রকারীরা ভালোভাবেই জানতেন।

আদালত আরো বলেন, ওই জনসভায় যেখানে আহসানউল্লাহ মাস্টার এমপিসহ টঙ্গী পৌরসভার মেয়র ও অন্য আওয়ামী লীগের নেতারাসহ শত শত আওয়ামী লীগ দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত থাকবে তা জেনেও সাজাপ্রাপ্ত অভিযুক্তরা মাহফুজুর রহমান মহলকে মারার জন্য ওই স্থানটিকেই কেন বেছে নেন। কারণ সাজাপ্রাপ্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো দ্বিধা কাজ করেনি যে এই সভায় বিক্ষিপ্তভাবে গোলাগুলি করলে প্রচুর লোক মারা যেতে পারে। এমনকি তাঁরা প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এই ঘটনার সময় কোনোরকম মুখাবরণ (মাস্ক) পর্যন্ত ব্যবহার করেননি। তাঁরা এতটাই বেপরোয়া ছিলেন এবং ভেবেছিলেন যে তাঁদের চেহারা অনাবৃত থাকার কারণে কেউ যদি তাঁদের চিনেও ফেলে তথাপিও তাঁদের কিছু হবে না। তাঁদের এই ধরনের ভাবনার কারণ হলো তাঁদের পেছনে এমন একটি শক্তি রয়েছে যে বা যাঁরা তাঁদের সব ধরনের ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য ঝামলা থেকে রক্ষা করার শক্তি রাখেন। স্থানীয় বেপরোয়া উচ্ছৃঙ্খল রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা এ ধরনের চিন্তা করতে পারে।

অভিমতে বলা হয়, নুরুল ইসলাম সরকারের টার্গেট ছিল মাহফুজুর রহমান মহল ও আহসানউল্লাহ মাস্টার। মাহফুজুর রহমান ছিল নুরুল ইসলাম সরকারের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী। আর আহসানউল্লাহ মাস্টার এমপি ছিলেন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই এ ধরনের জনসভায় আক্রমণ করে যদি দুজনকেই সরিয়ে দেওয়া যায় তবে এক ঢিলে দুই পাখি মারার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি নুরুল ইসলাম সরকার। তাই এ ব্যাপারে তিনি আসামিদের উৎসাহিত করেছেন।

এ হত্যাকাণ্ডকে মাসকিলিং উল্লেখ করে আদালত বলেন, যে স্থানে ও যেভাবে এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে তাকে এক কথায় বলা চলে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বা মাসকিলিং। তিন দিক থেকে আক্রমণের ফলে ঘটনাস্থলে অনেক লোক মৃত্যুবরণ করতে পারত। যেখানে কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম দ্বারা হত্যার উদ্দেশ্যে এক নিরস্ত্র বা বৃহৎ সমাবেশে আক্রমণ করা হয় এবং যেখানে অসংখ্য লোক নিহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যদি সেখানে একজন লোকও নিহত হন এই ধরনের হত্যাকাণ্ডকে বলা যায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বা মাসকিলিং। নিঃসন্দেহে আসামিরা এই মাসকিলিংয়ের জন্য সরাসরি দায়ী।

লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.