৩৮ মিনিটে উত্তরা থেকে মতিঝিল: চলছে মেট্রোরেল ডিপোর ভূমি উন্নয়ন –

1466186436নাজমুল লিখন: ঢাকা মহানগরীর পরিবহন ব্যবস্থা অধিকতর নিরাপদ, দ্রুততর ও পরিবেশবান্ধব করার উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছে মেট্রোরেলের কাজ। দেশের প্রথম এই মেট্রোরেল চালু হলে উত্তরা থেকে মতিঝিলে পৌঁছানো যাবে মাত্র ৩৮ মিনিটে। বর্তমানে ওই পথে বাসে যেতে সময় লাগে দুই থেকে চার ঘণ্টা বা তারও বেশি। প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করবে মেট্রোরেল। দুটি ট্রেনের মধ্যবর্তী সময় হবে ৫ মিনিট। ২০২৪ সালের মধ্যে মেট্রোরেল চালুর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সে সময়সীমা এগিয়ে আনা হয়েছে। এখন ২০১৯ সাল নাগাদ উত্তরা থেকে আগারগাঁও এবং ২০২০ সালের মধ্যে মতিঝিল পর্যন্ত শেষ হবে বহুল প্রত্যাশিত মেট্রোরেলের কাজ। সে লক্ষ্যেই কাজ করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা দেবে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। বাকি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার।
প্রকল্প পরিচালক মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, পুরো প্রকল্পের কাজ ভাগ করা হয়েছে ৮ ভাগে। আর্লি কমিশনিংয়ের জন্য কাজগুলো আগের সময়ের চেয়ে এগিয়ে আনা হয়েছে। আমরা আশা করছি নির্ধারিত সময়ের আগেই মেট্রোরেলের কাজ শেষ হবে। এজন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। ডিপো এলাকায় কিছু স্থাপনা অপসারণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে শিগগির। ধাপে ধাপে অন্যান্য কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
কেমন হবে মেট্রোরেল : রাস্তার মাঝ বরাবর ওপর দিয়ে চলবে এই মেট্রোরেল। প্রায় দোতলা সমান উঁচু প্লাটফরমের দৈর্ঘ্য হবে ১৭০ মিটার। স্টেশনগুলো হবে ওপরে, নিচতলায় হবে টিকেট কাউন্টার ও স্বয়ংক্রিয় প্রবেশ দ্বার। নিচ থেকে লিফট বা চলন্ত সিঁড়ির মাধ্যমে যাত্রীদের ওপরে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। এই ট্রেনের সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার। মেট্রোরেল প্রকল্পে বিদ্যুত্চালিত আধুনিক ট্রেনে যাত্রীরা চলাচল করবে। ঝুলন্ত সিম্পল ক্যাটনারি ওয়্যার সিস্টেম থেকে ১৫০০ ভোল্টেজ ডিসি বিদ্যুতের সাহায্যে চলবে এই ট্রেন। মোট ২৪ সেট ট্রেন থাকবে। প্রতি সেটে কোচ থাকবে ছয়টি করে। প্রতিটি কোচের প্রতি পাশে চারটি দরজা থাকবে। কোচ থাকবে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাও থাকবে এতে।
মেট্রোরেল প্রকল্পটি চালু হলে ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাস ব্যবহারকারী অনেক যাত্রী মেট্রোরেলে যাতায়াত করবে। এর ফলে বায়ুতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ অনেক কমবে বলে মনে করেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
মেট্রোরেল প্রকল্পটিতে কম্পন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। মেট্রোরেলের লাইনের নিচে এমএসএস (ম্যাস স্প্রিং সিস্টেম) থাকবে। ম্যাস স্প্রিং সিস্টেমে বিশেষ ধরনের বিয়ারিং থাকে, যার কাজ হল রেললাইনে যে কম্পন তৈরি হয় তা শোষণ করা। এর ফলে ট্রেন চলাচলের সময় আশপাশে তেমন একটা কম্পন অনুভূত হবে না। প্রকল্পটিতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণেরও বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে শব্দ তৈরির মাত্রা সাধারণ ট্রেনের চেয়েও কম থাকবে। এ ছাড়াও মেট্রোরেলের চলাচল পথে কিছু এলাকায় শব্দ শোষণকারী দেয়াল থাকবে। এই দেয়ালের ফলে শব্দের মাত্রা আরও কমে আসবে।
উত্তরা থেকে মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত চলাচল করবে মেট্রোরেল। ২০.১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রুটে থাকবে ১৬টি স্টেশন। এগুলো হল-উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয় এবং মতিঝিল।
কাজের অগ্রগতি : রাজধানীর উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরে বেড়িবাঁধ সংলগ্ন দিয়াবাড়ি এলাকায় গড়ে উঠবে মেট্রোরেলের ডিপো। বর্তমানে এই ডিপোর ভূমি উন্নয়নের কাজ করছে জাপানের টোকিও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। এতে ব্যয় হচ্ছে ৫শ’ ৬৭ কোটি টাকা। এখানেই থাকবে মেট্রোরেলের কোচ। এছাড়া ওয়ার্কশপ ও অন্যান্য দাফতরিক কাজ পরিচালনাও করা হবে এখানে। ২০১৮ সালের জুন নাগাদ এ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সম্প্রতি ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আগাছা পরিষ্কার করে ডিপোর ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিপো নির্মাণের জন্য রাজউক থেকে প্রায় ৫৯ একর জমি বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে মৌলিক নকশা তৈরি হয়েছে। বিস্তারিত নকশা (ডিটেইল ডিজাইন) তৈরি হবে আগস্টে।
এদিকে প্রাথমিক কাজের মধ্যে মাটি পরীক্ষা, রুট অ্যালাইনমেন্ট ও ট্রাফিক জরিপসহ বেশ কিছু জরিপের কাজ শেষ হয়েছে এরই মধ্যে। এছাড়া বিদ্যুত্ বিভাগ, তিতাস গ্যাস, টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি, ঢাকা ওয়াসা, বেসরকারি ইন্টারনেট সেবা ও টিভি কেবলসহ ১২টি সেবা ও অন্য সংস্থার লাইন ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে গিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, মেট্রোরেলের প্রথম ধাপের নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে জুনে। ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরই শুরু হবে ডিপোর পাইলিংয়ের কাজ।
সূত্রমতে, ডিপো এলাকার আশপাশের অন্তত ২০টি ছোট-বড় স্থাপনা সরাতে হবে। এর মধ্যে বড় একটি স্থাপনা মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজ। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পর এসব স্থাপনা অপসারণ করবেন মালিকরা।
মেট্রোরেল পরিচালনার জন্য গঠিত কোম্পানি ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড সূত্র জানায়, উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প প্রতিরোধে ডিপো নির্মাণে ‘স্যান্ড কনসেপশন পাইলিং’-এর সময় প্রচণ্ড কম্পন সৃষ্টি হবে। এতে ডিপো এলাকার ১৮ মিটারের মধ্যে যেসব স্থাপনা থাকবে, সেগুলো ভেঙে পড়ার আশঙ্কার কারণেই এগুলো অপসারণের কথা বলা হয়েছে। –
লাইক এবং শেয়ার দিয়ে পাশে থাকুন
20

Comments

comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.